সিলেট চেম্বারের বিরুদ্ধে ভুয়া ভোটার তৈরীর অভিযোগ
প্রকাশিত হয়েছে : ৯:২৫:০৪,অপরাহ্ন ৩০ মার্চ ২০১৯ | সংবাদটি ৩৮৯ বার পঠিত
আমাদের প্রতিদিন ডেস্ক:: নির্বাচনী তপশীল ঘোষণার পরও সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে ভুয়া ভোটার তৈরীর অভিযোগ উঠে। ভুয়া ভোটার সনাক্ত করে একটি তালিকাও প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। পরে অভিযোগ তালিকায় যুক্ত হয় স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নির্বাচনকালীন অতিমাত্রায় ভোটার তৈরী। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক বরাবরে তিন ব্যবসায়ী স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্র পাঠানো হয়। সেই সাথে ১৩ মার্চ ব্যবসায়ীদের স্বার্থে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ জানিয়ে ডিও লেটার প্রেরণ করেন সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। ডিও লেটারের জের ধরে এবং ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে আজ অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানে তদন্তে আসছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সদস্যের দল। সকাল ১০টা থেকে চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ কার্যালয়ে এই তদন্ত কাজ শুরু হবে বলে নির্বাচনী বোর্ড সূত্রে জানা গেছে। এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ডিও লেটারের পর ১৮ মার্চ অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সকল নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে মন্ত্রণালয়।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের নির্বাচনকে সামনে রেখে ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন সিলেটের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। ব্যবসায়ীরা বিষয়টি তুলে ধরে সঠিক ভোটার তালিকা প্রণয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিতে সুষ্ঠু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পরিবেশ তৈরী করার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেন ১৩ মার্চ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী বরাবরে একটি ডিও লেটার প্রেরণ করেন। ডিও লেটারের পর ১৮ মার্চ সিলেট চেম্বারের নির্বাচন স্থগিত করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। যদিও চেম্বারের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি অনুসন্ধান চালায়। তাদের অনুসন্ধানে ভোটার তালিকায় থাকা ৮৮ জন সদস্যকে চিহ্নিত করা হয় । যারা জাল আয়কর সনদের ( টিআইএন) মাধ্যমে সদস্য পদ লাভ করেন। এদের মধ্যে আপিলের মাধ্যমে সদস্যপদ ফিরে পায় ৬ জন । আপিলে সদস্যপদ ফিরে পাওয়া ৬ সদস্যের ব্যাপারেও অভিযোগ রয়েছে চেম্বার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক বরাবরে এরকম অভিযোগ জানিয়েছেন চেম্বারের সদস্য ব্যবসায়ী কামিল আহমদ। বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে জাল টিআইএন সার্টিফিকেট দিয়ে কয়েকশ’ ভোটার তৈরি করেছেন। নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অসৎ উদ্দেশ্যে গেলো বছরের ৮ ডিসেম্বর ৪ শ’ ৭৭ জন নতুন সদস্য করার অভিযোগ তুলেন তিনি।। অভিযোগে সিলেট চেম্বারের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদকে দায়ি করে ওই ব্যবসায়ী অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে আরো ভুয়া ভোটার রয়েছে মর্মে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানান।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সিলেট চেম্বারে বিগত দিনে চিনি ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপ এবং ঠিকাদার ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপ নামে কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও এবারই প্রথম এই দুই সংগঠনের সংযোজন ঘটে সিলেট চেম্বারে। শুধু এখানেই শেষ নয়, চিনি ব্যবসা কিংবা ঠিকাদার ব্যবসায়ী গ্রুপে যাদের নাম জড়িত করা হয়েছে তাদের অধিকাংশই পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। সিলেটে একাধিক চিনি ব্যবসায়ী ডিলার কিংবা আমদানিকারক থাকলেও চিনি ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের সদস্য হওয়া ৯ জনের মধ্যে ৬ জনই এক পরিবারের। বাকি ৩ জন, চিনি ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের সভাপতি ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদের ব্যক্তিগত স্টাফ। বিষয়টিকে ‘সালাউদ্দিন গং’ বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দাখিলকারী ব্যবসায়ী কামিল আহমদ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো তিন জন ব্যবসায়ী স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, এর ফলে ট্রেড গ্রুপে পূর্বে ৯ জন প্রতিনিধি থাকলেও বর্তমানে নতুন দুই সংগঠনকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ট্রেড গ্রুপে এখন প্রতিনিধিত্ব করছেন ১১ জন । এই ১১ জন ভোটার ভোটাধিকারের মাধ্যমে ৩ জন পরিচালক নির্বাচিত করবেন। বিষয়টি খুবই সহজসাধ্য হওয়ায় বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতেই নতুনভাবে উদ্যোগটি গ্রহণ করে।
এদিকে, গোলাপগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সাথে সংশ্লিষ্ট না থাকলেও টাউন এসোসিয়েশন থেকে গোলাপগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স থেকে প্রতিনিধিত্ব করার আবেদন জানান শমশের জামাল। ওই আবেদনে রাসেল আহমদ, শামীম আহমদ এবং সেলিম আহমদ নামের ৩ ব্যবসায়ীরও স্বাক্ষর ছিলো। কিন্তু ওই আবেদনের পর বিষয়টি তাদের নজরে এলে এই তিন ব্যবসায়ী শমশের জামালের আবেদনপত্রে তাদের যে স্বাক্ষর রয়েছে,তা ভুয়া বলে অভিহিত করে গোলাপগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্যাডে লিখিত রেজুলেশনসহ সিলেট চেম্বার বরাবরে অভিযোগ দাখিল করেন।
গোলাপগঞ্জ চেম্বারের তিন ব্যবসায়ী অভিযোগটি আমলে নিয়ে শমশের জামালের আবেদনটি খারিজ করে দেয় সিলেট চেম্বারে নির্বাচন কমিশন। সেই সঙ্গে ওই আবেদনটি ভুয়া বলে চিহিৃত করে। পরে রহস্যজনক কারণে নির্বাচনী আপিল বোর্ড আবেদনটিকে বৈধ বলে পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকায় আবার অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। একইভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া আরো ৫ ব্যবসায়ী আপিলের মাধ্যমে সদস্যপদ ফিরে পান। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ-সদস্যপদ ফিরে পাওয়াদের মধ্যে আয়কর সনদ হালনাগাদ না থাকা সদস্যও রয়েছেন।
এ বিষয়ে আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান এডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম বলেন, আপিলকারীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই নিজেদের সদস্য পদ ফিরে পেয়েছেন। টাউন এসোসিয়েশন প্রতিনিধির বিষয়ে তিনি বলেন, স্বাক্ষর থাকা ২৫ জনের মধ্যে ৩ জনের আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
চিনি ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের নির্বাচনী পরিচালনা বোর্ডে ঠিকাদার ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের সভাপতি এবং ঠিকাদার ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের সভাপতিকে চিনি ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের নির্বাচনী পরিচালনা বোর্ডের প্রধান করে উভয় সংগঠনের প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছে। শুধুমাত্র বিষয় পরিবর্তন করে তারিখবিহীন দুটি গ্রুপের রেজুলেশনটিও লেখা রয়েছে একইভাবে। আবার চিনি ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের সভাপতি ফালাউদ্দিন আলী আহমদের স্থলে প্রতিনিধি মনোনীত করা হয় বড় ভাই সালাউদ্দিন আলী আহমদকে। তবে, চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদে নবায়নের জন্য সালাহ উদ্দিন আলী আহমদের দাখিলকৃত কাগজপত্রে (০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮) টিআইএন সনদ হালনাগদ নেই ।
একই প্রতিষ্ঠানের লিগ্যাল এডভাইজার থাকা অবস্থায় এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম নির্বাচনী আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন দক্ষিণ সুরমার ফিরোজপুরের হীরা বেকারীর স্বত্বাধীকারী সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সদস্য হারুনুর রশীদ। তিনি বলেন, অবশ্যই এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার প্রয়াস চালাচ্ছে চেম্বারের বর্তমান শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। তিনি বিষয়টিকে আইন সম্মত নয় বলেও দাবি করেন।
ত্রুটিপূর্ণ ভোটার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান বিজিত চৌধুরী বলেন, জাল আয়কর সনদ প্রদানের মাধ্যমে ভোটার হওয়া ত্রুটিপূর্ণ ৮৮ টি ভোটার সনাক্ত করে সদস্যপদ বাতিল করে দেয় নির্বাচন কমিশন । পরবর্তীতে ৬ জন ভোটার আপিলে সদস্যপদ ফিরে পেলেও বিষয়টি আমাদের জানায়নি আপিল বোর্ড। সমন্বয়হীনভাবে আপিল বোর্ড তড়িগড়ি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। বিজিত চৌধুরী বলেন, ভোটার তৈরী করে পরিচালনা পর্ষদ। আর কাগজপত্র যাচাই করে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের হাতে সময় বেশি থাকলে আরো ভুয়া ভোটার সনাক্ত করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
এ বিষয়ে আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র আইনজীবী এমাদ উল্ল¬াহ শহিদুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত ৮৮ জন ভোটারের মধ্যে ৬ জন সদস্য আপিলের আবেদন জানায়। আপিলকারীদের উত্থাপিত কাগজপত্র যাচাই বাছাই শেষে সন্দেহাতীত মনে হলে সদস্য পদ ফিরিয়ে দেয় আপিলবোর্ড। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সময়ের জন্য। বছরব্যাপী সদস্যপদ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করলে এমনটি হতোনা। আজ শনিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত দল বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিলেট চেম্বার থেকে ফোনে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তদন্ত দল চাইলে সেখানে যেতে কোনো বাঁধা নেই বলেও জানান তিনি।