ব্যাংকাস্যুরেন্স: ব্যাংক-বিমা খাতের সম্ভাব্য জিয়নকাঠি
প্রকাশিত হয়েছে : ১:৪৮:১৭,অপরাহ্ন ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | সংবাদটি ৫২৩ বার পঠিত
।। মোঃ নূর-উল-আলম এসিএস ।।
বাংলায় বিমা ব্যবসার ইতিহাস দু’শত বছরেরও বেশী পুরোনো । কেননা ভারতবর্ষর প্রথম বিমা কোম্পানি ওরিয়েন্টাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতায় ১৮১৮ সালে । বৃটিশ ভারতে বিমা শিল্প বেশ সমৃদ্ধ ছিল । তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭-১৯৭১ সময়কালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে বিমা ব্যবসাও বেশ ভালো অবস্থায় ছিল । কিন্তু , স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের ইন্স্যুরেন্স বা বিমা শিল্প তার ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে । অথচ স্বাধীনতারপূর্বে এখাত বেশ সমৃদ্ধ ছিল , ছিল বিশ^মানের – বিশ^ বাজারের অংশ। সেই সময় বিদ্যমান ৪৯টি বিমা কোম্পানির মধ্যে ১০টির প্রধান কার্যালয় ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে , ২৭টির প্রধান কার্যালয় ছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে এবং বাকী ১২টি বিমা কোম্পানির প্রধান অফিস ছিল পাকিস্তানের বাইরে বিশে^র নানা দেশে। বিশে^র অন্যান্য দেশ যেখাতে এগিয়েছে সামনের দিকে , আমরা রয়ে গেছি সেই তিমিরেই ; সত্তরের দশকের যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে । বিশে^র উন্নত দেশগুলোর জিডিপিতে বিমা অবদান গড়ে দশ শতাংশের মত । অথচ বাংলাদেশের জিডিপিতে বিমা কোম্পানিগুলোর অবদান মাত্র দশমিক নয় শতাংশ। অর্থাৎ এক শতাংশেরও কম !
শুধুমাত্র গ্রাহকদের আস্থাহীনতা, ব্যাংকের এক শ্রেণীর শাখা ব্যবস্থাপক এবং বিমাগ্রাহক কোম্পানিগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনৈতিক কমিশন বানিজ্যের লোভের কারনে সম্ভাবনার এ বাজার আজ দিকভ্রান্ত নাবিকের মত চলছে । এককথায় জীবন বিমা কোম্পানিগুলো ধুঁকছে গ্রাহকদের আস্থাহীনতা তথা আস্থার অভাবে এবং সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলো এক শ্রেণীর ব্যাংক শাখা ব্যবস্থাপক এবং বিমাগ্রাহক কোম্পানিগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনৈতিক কমিশন বানিজ্যের লোভে । অথচ , কোন রকম নজরদারি এবং করের
ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে সেসব ব্যাংক শাখা ব্যবস্থাপকবৃন্দ এবং বিমাগ্রাহক কোম্পানিগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগন ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন। এদিকে সম্প্রতি ব্যাংক শিল্পও আশানুরূপ ফল দিচ্ছে না । সুতরাং ব্যাংকাস্যুরেন্সই হতে পারে এর অন্যতম সমাধান।কারণ ,ব্যাংক ও বিমা কোম্পানির অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিমা পন্য বিক্রি করা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান হত সহজেই ।
বিমা খাতে বিদ্যমান পন্য বা সেবার ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা যায় জীবন বিমার অনেক গুলো পলিসি বা পণ্য বানিজ্যিক ব্যাংক গুলোতে প্রচলিত মেয়াদী হিসাবের অনুরূপ । কিন্তু, এর বাড়তি সুবিধা হলো পলিসি গুলো বিমা গ্রাহকের মৃত্যু ঝুঁকিসহ আরো অনেক ঝুঁকি বহন করে থাকে যদিও মেয়াদান্তে পলিসি গ্রাহকের স¤ভাব্য মোট জমা ব্যাংকের তুলনায় কম হয়। গ্রাহকদের কাছে সে বিষয়টাও গৌণ। কেননা , ঝুঁকি মানব অভিজ্ঞতার সবচাইতে অবিরত ঘটমান এবং চ্যালেঞ্জিং বিষয় । অপ্রত্যাশিত দূর্ঘটনার ক্ষেত্রে আর্থিক সামর্থ প্রদানের মাধমে একমাত্র বিমাই গ্রাহকদের স্বাস্থ্য, দ্রব্য-সামগ্রী এবং ব্যবসায়ের ঝুঁকির প্রভাব হ্রাস করে ।
জীবন বিমার ক্ষেত্রে , মূল সমস্যা হলো জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর প্রতি গ্রাহকদের আস্থার সংকট বা আস্থাহীনতা যার শিকড় জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর সেবা বিক্রি প্রক্রিয়ায় নিহিত। জীবন বিমা কোম্পানিগুলো এজেন্ট চালিত। জীবন বিমা কোম্পানি গুলো সেবা বিক্রির জন্য অতিমাত্রায় এজেন্টদের উপর নির্ভরশীল । আইন পর্যালোচনা করে দেখা যায় এসব এজেন্টরা কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন না । অথচ, গ্রাহকরা মূলত এজেন্টদের কাছেই প্রিমিয়ামের অর্থ জমা দেন । ফলে গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থ বিমা-অফিসে সঠিকভাবে এবং সময়মত জমাদান , গ্রাহকদের তথ্য পূরণ এবং প্রিমিয়ামের জমাকৃত অর্থ ফেরত পাবার প্রশ্নে একটা সংকট তৈরী হয়েছে । বাংলাদেশে প্রচলিত বিমা আইন-২০১০ এর ধারা ৫৮(৩) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এক জন এজেন্ট তার সংগৃহীত বিমা পলিসির প্রথম বৎসরের প্রিমিয়ামের শতকরা ৩৫ (পঁয়ত্রিশ) ভাগ; দ্বিতীয় বৎসরের নবায়ন প্রিমিয়ামের শতকরা ১০ (দশ) ভাগ; এবং পরবর্তী বৎসরসমূহে(পরবর্তি আট বছর ) নবায়ন প্রিমিয়ামের শতকরা ৫ (পাঁচ) ভাগ কমিশন হিসেবে পেয়ে থাকেন । ফলে নগদ অর্থের লোভে এজেন্টরা নতুন গ্রাহক খোঁজায় ব্যস্ত থাকেন । পুরোনো গ্রাহকদের ফলো-আপ করার অভাবে জীবন বিমা পলিসি তামাদি হয়ে পড়ে । পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় , বাংলাদেশে জীবন বিমা পলিসিগুলোর প্রায় আশি ভাগই মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত টিকে না । উপরšতু, মেয়াদ শেষে তামাদি কিংবা পূর্ণ-মেয়াদ পর্যন্ত জমাকৃত পলিসি অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রশ্নে বিমা কোম্পানিগুলোর উদসীনতা এবং দীর্ঘসূত্রিতা গ্রাহকদের আস্থার সংকটকে প্রকট থেকে আরো প্রকটতর করে তুলেছে । গ্রাহকের অভাবে কিছু জীবন বিমা কোম্পানি পল্লী বা মফস্বল এলাকায় নিজেদের শাখা বন্ধ করে দিয়েছে এবং অন্যান্য কোম্পানির অধিকাংশ শাখাও প্রায় নিভু নিভু ।
অন্যদিকে নন-লাইফ বা সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলো শাখা চালিত । এদের সংকটের প্রধানতম কারণ এজেন্ট কমিশনে গ্রাহকদের ভাগ বসানো বা ডিসকাউন্টিং । ব্যবসা সংগ্রহে নিজেদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগীতার কারনে বিমা কোম্পানিগুলোর এজেন্ট কমিশনের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বিমা গ্রাহক সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু চক্র । এক শ্রেণীর ব্যাংক কর্মকর্তা এবং বিমা গ্রাহক কোম্পানিগুলোর কর্মাশিয়াল কর্মকর্তাদের লোভে নন-লাইফ বিমা কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে বিমাকর্মীদের জন্য বরাদ্দ এ খাতে মজুরির পুরোটাই । ফলে নন-লাইফ বিমা কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় খরচ বাড়ছে , অপারেশনাল মূলধন বেশি লাগছে এবং বঞ্চিত হচ্ছে লাভের বিশাল একটা অংশ থেকে । অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় নন-লাইফ বিমা কোম্পানিগুলোর শেয়ার বাজারসহ অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে । একই কারনে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে তাদের ক্লেইম পরিশোধের সক্ষমতাও। শতকরা হিসেবে যদিও তা মোট বিমা ব্যবসার পনের শতাংশর মত কিন্তু অংকের হিসেবে সেটা বিশাল ! অন্যদিকে ব্যাংক কর্মকর্তা এবং বিমা গ্রাহক কোম্পানিগুলোর কর্মাশিয়াল কর্মকর্তাদের অনানুষ্ঠানিক আয় হবার কারনে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে আয়কর রাজস্ব থেকে । উপরন্তু ইনফরমাল বা অনানুষ্ঠানিক আয় হওয়ায় এ সকল আয় জিডিপি গণনায়ও বাদ পড়ছে ।
ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু হলে গ্রাহক আস্থাহীনতা এবং ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকদের অনৈতিক কমিশন বানিজ্যের দৌরাত্ম কাটিয়ে বীমা শিল্প হবে ব্যাংক শিল্পর প্রধানতম মূলধন ,তারল্য এবং মুনাফার যোগানদাতা। গ্রাহক পাবে বিনিয়োগের নতুন খাত ; ব্যাংকের মাধ্যমে জমাদেয়া তার পাওনা , প্রিমিয়ামের বিপরীতে প্রাপ্য অর্থ দ্রæততম সময়ে ফেরত পাবার নিশ্চয়তা। এটি এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা যেখানে গ্রাহক,বিমা কোম্পানি এবং ব্যাংক সবাই লাভবান হবে ; লাভবান এবং সমৃদ্ধ হবে দেশ । এতে ন্যুনতম খরচে একই গ্রাহকের অর্থ একাধিক খাতে হাত বদল হবার কারনে অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার হবে , স্ফীত হবে জাতীয় আয় এবং জিডিপি ।
জাতীয় আয় বৃদ্ধির কাজটি কীভাবে হয় বিশ্লেষন করলে বিষয়টি বুঝতে আরো সুবিধা হবে ।প্রথমেই দেখি আমরা আয় করে আসলে কী করি । ব্যক্তি মাত্রই আয় করে তার একটা অংশ ব্যয় বা ভোগ করেন এবং উদ্ধৃতাংশ সঞ্চয় করেন । ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় তিনি বিনিয়োগ করেন । এরূপ ব্যষ্টিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় সমষ্টিকভাবে বিশাল মূলধনের যোগান দেয়। সমষ্টিকভাবে সকল আয়, ব্যয় তথা ভোগ, সঞ্চয়,বিনিয়োগ কিংবা উৎপাদন বৃদ্ধি চক্রাকারে জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে । কেননা অর্থনীতিতে কোন একটি উপাদান বা চলকের হ্রাস-বৃদ্ধি অপরাপর চলকগুলোর হ্রাস বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে ।
যদি সম্পূর্ণ বিষয়টিকে আয়ের দৃষ্টিতে দেখি,তাহলে আমরা দেখি জনগণের আয় বাড়লে সঞ্চয় বাড়ে,সঞ্চিত অর্থ মূলধনের যোগান বাড়ায়,ফলে মূলধন বাড়ে।নতুন মূলধন বিনিয়োগ বাড়ায় এবং বর্ধিত বিনিয়োগ কর্মসংস্থান বাড়ায় এবং আবারও জনগনের আয় বাড়ে । এভাবে চক্রাকারে চলতে থাকে । অপরদিকে , যদি ব্যয়ের দৃষ্টিতে দেখি , আমরা দেখি ব্যয় বাড়লে জনগনের দ্রব্য-সামগ্রী বা সেবা ক্রয়ের চাহিদা বাড়ে এবং ভোগ বাড়ে।এ বর্ধিত চাহিদার কারনে তৈরী হওয়া নতুন যোগান মেটাতে বিনিয়োগ বাড়ে। ফলে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং দেশের মোট উৎপাদন বাড়ে । বর্ধিত কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনের কারনে জনগনের আয় বাড়ে । আয় বাড়ায় জনগনের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আসে এবং বর্ধিত অর্থ ব্যয় তথা ভোগ বাড়ায় । এভাবে চক্রাকারে চলতে থাকবে । বর্ণিত কার্যক্রম গুলোর কোন একটি অনুঘটকের ইতিবাচক পরিবর্তন বাকীগুলোরও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায় । উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি দেশের জাতীয় আয়ের মূল অনুঘটক গুলো বলা যেতে পারে । ভেনিজুয়েলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জাতীয় আয় বৃদ্ধির অনুঘটক হলো তেল উৎপাদন তথা তেল রপ্তানির মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি। এক সময়ের জেলে পাড়া সিংগাপুরের সমৃদ্ধির মূলে আছে ভৌগলিক অবস্থানের কারনে স্থাপিত
সমুদ্র বন্দরের সেবা প্রদান করে জাতীয় আয় বৃদ্ধি। চীনকে বলা হয় পৃথিবীর কারখানা ; চীনের জাতীয় আয় বৃদ্ধির অনুঘটক হলো ব্যাপক পণ্য উৎপাদন । এটা সকলেরই জানা আজকের সমৃদ্ধ মালেশিয়ার মূলে রয়েছে সঞ্চয় বৃদ্ধির ইতিহাস । এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্ম চাঞ্চল্যের মূলে আছে ভোগ বৃদ্ধি।
শুধু মাত্র ভোগ বৃদ্ধি , যার প্রধান অর্থ যোগান দাতা প্রবাসী আয় এবং তৈরী পোষাকখাতের রপ্তানি আয় , দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে তার ইপ্সিত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব না। কেননা , পাল্øা দিয়ে বাড়ছে জনসংখ্যা । অথচ বিনিয়োগের বিকল্প খাত তৈরী না হওয়ার ফলশ্রæতিতে বিনিয়োগ বাড়ছে না ,বাড়ছে না কর্মসংস্থানও ।‘ মড়ার উপর খড়ার ঘা ’ হিসেবে যোগ হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান প্রায় শত ভাগ পাসের হার । ফলে বাড়ছে পুঞ্জিভূত ব্যাপক বেকারত্ব । বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে , বর্তমানে(২০১৯) বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার প্রায় ৪.৬ শতাংশ । সংখ্যার হিসেবে তা প্রায় ১.৩৮ কোটি ! মনে রাখতে হবে এ পরিসংখ্যানে ছদ্ম বেকারত্বেকে বিচেনায় নেয়া হয়নি । তা বিবেচনায় নিলে হারটি আরো বাড়বে । (চলবে)
লেখক: সহযোগী সদস্য, ইনিস্টিউট অব চাটার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ ( ICSB)