সিলেটের মেয়ে ঢাকায় কাউন্সিলর: ডেইজি’র ওঠে আসার গল্প
প্রকাশিত হয়েছে : ২:০৫:৫২,অপরাহ্ন ২৬ জানুয়ারি ২০১৭ | সংবাদটি ২৮৮৫ বার পঠিত
রফিকুল ইসলাম কামাল : ডেইজী সারওয়ার- বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জে, কাউন্সিলর ঢাকার! যতোটা সহজে কথাটা উল্লেখ করা গেল, ততোটা সহজে আজকের অবস্থানে পৌঁছাননি ডেইজি। ধাপে ধাপে, লড়াই করে, মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে সাধারণ মানুষের আস্থাভাজন হয়েই আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত ৩১, ৩৩ ও ৩৪ নং ওয়ার্ডের (আসন-১২) কাউন্সিলর হয়েছেন ডেইজি। প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে যুব-মহিলা আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত এই নেত্রী বর্তমানে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারস্থ পারিবারিক বাসভবনে সিলেটভিউ২৪ডটকম’র সাথে একান্তে কথা বলেন ডেইজি। আলাপচারিতায় ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
সিলেটের একটি সমভ্রান্ত ও রাজনৈতিক পরিবার থেকে ওঠে আসা ডেইজির। বাবা বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী মো. মতলিব আলী। চাচা ও মামারা জড়িত ছিলেন রাজনীতির সাথে।
মামা বাবরুল হোসেন বাবুল ৭১-এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিলেট পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান পরে উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। চাচা এ কে এম গাউছ সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।
অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালীন থেকেই নেতৃত্ব দেয়ার সৌভাগ্যের শুরু ডেইজির। ওই স্কুলের ৭ম শ্রেণীতে থাকা কালেই ইয়েলো বার্ড লিডার ও পরবর্তীতে গার্লস গাইড লিডার ছিলেন তিনি। দ্বিতীয় জাতীয় গার্লস গাইড ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করে তিনি বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেন। সিলেট বিভাগের প্রথম ভলিবল টিমের সদস্য ছিলেন তিনি। খেলেছেন জাতীয় পর্যায়েও। গান গাইতেন, গীটার বাজাতে পারতেন, ওইটুকুন বয়সেই গাড়ি চালানো শিখে ফেলেন। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনেরও তালিকাভূক্ত শিল্পী। সবমিলিয়ে ভবিষ্যত নেতৃত্বের বীজ তখনই তার মধ্যে বোনা হয়ে গিয়েছিল। ওই ৭ম শ্রেণীতে থাকা কালেই সিলেটের স্থানীয় শিশু-কিশোর পত্রিকা ‘ঝুমকোলতা’য় সাক্ষাৎকার দেন ডেইজি।
মেট্রিক (এসএসসি) শেষে ঢাকার লালমাটিয়া চলে যেতে হয়। এজন্য সিলেটে ছাত্র রাজনীতিতে জড়ানোর সুযোগ হয়নি ডেইজির। ১৯৯০ সালে সেনা কর্মকর্তার সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে। এরপর ক্যান্টনমেন্টের দীর্ঘ জীবন। সাধারণ মানুষের সাথে ওঠাবসা বন্ধ। বিয়ের পর ধাপে ধাপে মাস্টার্স পাশ করেন তিনি।
ডেইজি বললেন, ‘২০০০ সালে স্বামী গোলাম রাসুল ভূইয়া রিটায়ার্ডের পর সাধারণ মানুষদের সাথে ফের চলাফেরা শুরু হয়।’ কিন্তু রাজনীতিতে কিভাবে পা রাখা?
ডেইজি বলেন- অধ্যাপিকা অপু উকিল এমপির মাধ্যমে আমি জানতে পারি ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী ও যুব মহিলাদের নিয়ে যুব মহিলা লীগ করবেন শেখ হাসিনা। তখনই অপু উকিলের অনুপ্রেরণায় যুব মহিলা লীগে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তবে দলের নেত্রীদের জানিয়ে দেই রাজনীতিতে পেছনে নয়, সামনে থেকেই কাজ করবো। এখন পর্যন্ত দলে শ্রম সাধনা দিয়েই আমি আজকের এ অবস্থানে এসেছি।’
তবে রাজনীতিতে আসার পথে পরিবার থেকে বাঁধা ছিল ডেইজির। তিনি জানালেন, বাবা কিংবা মামাবাড়ির কেউই তার রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখাননি।
২০০০ সালেই আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার সাথে অপু উকিল, নাজমা আক্তার, ডেইজি সারওয়ারসহ বেশ কয়েকজন দেখা করেন। তিনি যুব-মহিলা লীগের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখান। কাজ শুরু করতে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন। পরে শেখ হাসিনাই নাজমা আক্তারকে আহবায়ক এবং অপু উকিলকে যুগ্ম-আহবায়ক করে একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করে দেন। ওই কমিটির সদস্য ছিলেন ডেইজি। শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় সম্মেলনের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানা কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দেন।
সেই নির্দেশনা মেনে ঢাকার মোহাম্মদপুরে দেশের প্রথম যুব-মহিলা লীগের কমিটি গঠন করেন ডেইজি। শেখ হাসিনা যুব-মহিলা লীগের নেত্রীদের বলেন, যেহেতু তার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের শুরুটা তিনি সিলেট থেকেই করেন, এজন্য সিলেটে কমিটি গঠন করতে চান তিনি। ঢাকার গুলিস্তানে যুব-মহিলা লীগের অফিসে মাঝেমধ্যে আসতেন হাসিনা। একদিন সেখানে এসে ডেইজিকে সিলেটে কমিটি গঠন করতে পারবেন না কিনা জিজ্ঞেস করেন তিনি। পিছপা হননি ডেইজি। ‘পারবো’ নেত্রীকে বলে দেন তিনি। নেত্রী পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘অনেকেই তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে, বিদ্রুপ করবে। তুমি নতুন দোকান নিয়ে এসেছো, এটাও বলবে। কিন্তু সেসবে কান দিও না।’
ডেইজি কোমর বেঁধে নেমে পড়েন কাজে। নেত্রীর সেই পরামর্শ দেখলেন অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাচ্ছে! কেউই তাকে সহজভাবে নিতে পারেনি। কিন্তু দমে যাননি ডেইজি। সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করে পরামর্শ, উপদেশ, সহযোগিতা চান। বিভিন্ন বান্ধবী, পরিচিতজন, আত্মীয়স্বজন সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেন। একপর্যায়ে দাঁড় করিয়ে ফেলেন কমিটি। শেখ হাসিনা স্বয়ং ঘোষণা করলেন যুব-মহিলা লীগ, সিলেটের কমিটি।
ডেইজির কাজে সন্তুষ্ট হয়ে শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব দিলেন ডেইজিকে। সেখানেও কমিটি গঠনে সফলতা দেখান তিনি। একপর্যায়ে দেশের বিভিন্ন জেলা-থানার কমিটি গঠন শেষে কেন্দ্রীয় সম্মেলনের তোড়জোড় শুরু হলো। নেত্রীর কাছে জমা দেয়া বায়োডাটায় ডেইজি কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক পদ চাইলেন। পদ পাওয়ার জন্য চলতে থাকলো লবিং। কিন্তু সেসবে গেলেন না ডেইজি। কমিটি ঘোষণা হলো। ঠিকই কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদটি পেলেন ডেইজি। তবু তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না, ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! এতো এতো নেত্রীর ভীড়ে আমি পদটা পেয়ে যাবো, তা যেন কল্পনা মনে হচ্ছিল।’
ডেইজির অবাক হওয়ার আরো বাকি। ততোদিনে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। শেখ হাসিনা জেলে। প্রতিদিন নেত্রীকে দেখার আশায় সাবজেলের সামনে গিয়ে বসে থাকতেন ডেইজি। রাজপথেও সক্রিয়। অনিবার্যভাবেই গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করতে হলো তাকে। এরআগেও, ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে জেলে যেতে হয় ডেইজিকে।
কারাবরণ শেষে মুক্তি পেলেন। সব খবর কিন্তু জানেন শেখ হাসিনা। ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন চলে এলো। সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকা উত্তর থেকে লড়বেন। দলের হাইকমান্ডের অনুমতি পেয়ে কাজ শুরু করলেন। যে এলাকা থেকে নির্বাচনে লড়েছেন, সে এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন ডেইজি। মোহাম্মদপুর ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা তিনি, লায়ন্স ক্লাব, এপেক্স ক্লাবসহ বিভিন্নভাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিচরণ তার। এজন্য মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ছিল ডেইজির। দল-মত নির্বিশেষে সবার ভোট পেয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন ডেইজি।
আরো কিছু পাওয়ার বাকি ডেইজির! ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের অধিবেশনে যাবেন। ডাক পড়লো ডেইজির, ‘আপনার পাসপোর্ট গণভবনে দিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রীর সাথে সফরসঙ্গী হচ্ছেন আপনি’! পাসপোর্ট দিলেন। ভিসা লাগলো। প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী হলেন। সবকিছু যেন কেমন স্বপ্নের মতো ঘটে গেলো! ‘আমার আর কি চাওয়ার থাকতে পারে!’ বলছিলেন ডেইজি।
চাওয়ার না থাকলেও দেয়ার আছে মানুষকে। সেটা দিয়ে যেতে চান ডেইজি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষের জন্য রাজনীতি করে যেতে চান। এটাই তার রাজনৈতিক লক্ষ্য। ব্যক্তি জীবনে এক ছেলে-মেয়ের মা তিনি। মেয়ে যুক্তরাজ্যে অ্যারো স্পেস নিয়ে এবং ছেলে দার্জিলিংয়ের সেন্ট যোসেফে পড়ছে।