সত্যসন্ধানী ও মানবপ্রেমিক সৈয়দ আবদুল কাদির
প্রকাশিত হয়েছে : ১:১০:০৭,অপরাহ্ন ১২ এপ্রিল ২০২১ | সংবাদটি ৭৮০ বার পঠিত
বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল:
পৃথিবীতে জন্ম নিলেই মৃত্যুর সম্মুখীন হতে হবে। পৃথিবীটা এমন একটি চেইন অব কমান্ডে অবিরত চলছে। অর্থাৎ মানুষ জন্ম নেয় মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য। এক অমোঘ নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে তাঁকে সমাপ্তির দিকে এগুতে হয়। এটা একমাত্র আল্লাহ পাকের শাশ্বত এবং চিরন্তন বিধান। পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই, এ বিধানকে পরিবর্তন করার। তাই জন্মের সাথে সাথে কারো জীবনপ্রদীপ একেবারে নিভে যায়, কিন্তু কিছু মানুষ এমনই ক্ষণজন্মা, যাদের জন্ম হয় মানবতার জন্য, মানুষের জন্য। তাঁদের মৃত্যুই তাঁদেরকে বাঁচার পথ প্রশস্ত করে দেয়। সমাজ ও দেশের জন্য তাঁদের আত্মত্যাগ কাল থেকে কালান্তরে মানুষের মধ্যে প্রেরণা হয়ে কাজ করে। তাঁদের সততা, কর্মপরায়ণতা, কর্তব্যনিষ্ঠতা, আন্তরিকতা এবং মানবতার প্রতি হৃদয়ের কৌতূহল মানুষকে ভালোবাসতে হৃদয় থেকে বাধ্য করে। ‘জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো’ ছোটোবেলায় স্কুলে পড়া এই সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক চিন্তার অভিব্যক্তিটি ব্যক্তির চিন্তা-চেতনায় প্রভাব ফেলে থাকে। জীবনকে দেখার যে অভিনব-বাস্তবসন্ধানী চোখ, মানবতার গলনে তাঁর প্রায়োগিতার প্রকাশ ঘটে। তেমনি এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন সিলেট শহরের নৌবাহিনির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও প্রবীণ ব্যক্তিত্ব সৈয়দ আব্দুল কাদির। তাঁর জীবন সমৃদ্ধ হয়েছে নানামাত্রিকতায়। তিনি দেখেছেন অর্ধশতাব্দী ধরে মানবিকতার বিপর্যয়। কিন্তু বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়াননি। বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমাজ এবং দেশের কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। দেখেছেন ভারতীয় উপমহাদেশকাল, পাকিস্তানের দুঃশাসন, বাংলাদেশ এবং সর্বোপরি ব্রিটিশ শাসিত সময়। বিভিন্ন বাঁকে তাঁর জীবনাভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হয়েছে। তিনি সেই জীবনকেই উপলব্ধি করেছেন, জীবনকে সেই বাস্তবিকতায় সফল করে তুলেছেন তাঁর কর্ম দিয়ে। তাই তিনি সিলেটের মানুষের গর্বের একজন ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের একজন সুনাগরিক হিসেবে তিনি যে ভূমিকা এবং অবদান রেখেছেন তাঁর চিন্তা সুদূরপ্রসারী হয়ে বাঙালিকে প্রভাবিত করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
আমরা জানি, প্রত্যেক প্রাণীকে মরতে হবে। ছারপোঁকা থেকে শুরু করে প্রাণওয়ালা যত সৃষ্টিজীব আছে সবাইকে মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যুর কবল থেকে জগতের কোন তাবৎ পরাশক্তি কোনো প্রযুক্তি কাউকে বাঁচাতে পারবে না। এখানে সবাই অম। মৃত্যুর নির্ধারিত সময় থেকে এক সেকেন্ড কমবেশি করার মতা রাখেনা জগতের কোন দাপটশালী মোড়ল। মৃত্যুর অনিবার্য স্বাদ প্রত্যেক প্রাণীকে পান করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে’। (সূরা আলে ইমরান : ১৮৫)
উর্দু প্রবাদে বলা হয়েছে, ‘মওত কা সিন কুল্লু নাফসিন শারেবু, কবরু বইতুন কুল্লু নাফসিন দাখিলুন’- প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, আবার প্রত্যেক প্রাণীকে কবরের সম্মুখীন হতে হবে’। সময়ের কালক্রমে, সৈয়দ আব্দুল কাদির সেই মৃত্যু নামক গাড়ির জন্য অনন্তের যাত্রী হলেন। ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দুপুর ১১.৫০ মিনিটে তিনি সিলেট শহরের রামেরদিঘির পশ্চিমপারে তাঁর নিজস্ব বাসভবনে চির বিদায় নেন। ঐদিনই এশার নামাজের পর নগরীর দরগাহে শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গনে তাঁকে সমাহিত করা হয়। সৈয়দ আবদুল কাদির ছিলেন সকলের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিভাবক-পরামর্শক। তাঁর ছিল এক সমৃদ্ধ ও বর্ণাঢ্য জীবন। পাকিস্তান নৌবাহিনীতে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধেও রেখেছেন বিশেষ অবদান। এছাড়াও সমাজসেবক হিসেবেও তাঁর রয়েছেন অনন্য সম্মান। দেশমাতৃকার প্রতি প্রেম তাঁকে সমাজসেবায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি প্রবীণ ব্যক্তিত্বদেরকে নিয়েও সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ব্রিটিশ রাজপরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। নিবেদিতপ্রাণ এই সমাজসেবক ২০ আগস্ট ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে গোলাপগঞ্জ উপজেলার কদমরসুল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
ম্যাট্রিক পাশ করার পর তিনি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ আগস্ট পাকিস্তান নৌবাহিনীতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে একজন প্রকৌশলী হয়ে যোগদান করেন। তিনি পাকিস্তান নৌবাহিনিতে সহযোগী প্রকৌশলীদের ডিপ্লোমার সমতুল্য আর্টিাফসার্স কোর্স সম্পন্ন করেন। ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার্স-এর চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পাকিস্তান নৌবাহিনীতে দীর্ঘ ২৩ বছর কাজ করেন।
সৈয়দ আব্দুল কাদির ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তবে তিনি তাঁর চাকরি জীবনে তিনবার যুক্তরাজ্য সফর করেন। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত এইচএম রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ-এর রাজকীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে গার্ড অব অনার উপস্থাপনার জন্য পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে উপস্থাপনার জন্য অংশগ্রহণকারী পাকিস্তানের নৌ জাহাজের পিএনএস জুলফিকারের ১২০ জন ভাগ্যবান গার্ড সদস্যদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন। এতে রানীর রাজকীয় ক্ষমতায় প্রত্যেক ভাগ্যবান সদস্য রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানের পদক পেয়েছিলেন। তিনি ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের পে একটি নৌ জাহাজ পিএনএস বাবর, আনুষ্ঠানিকভাবে এইচএমএস দিয়াডেমের দায়িত্ব নিতে ইংল্যান্ডে সফর করেন। এছাড়া ক্রুজার মেরামত, পুননির্মাণ, প্রয়োজনীয় প্রশিণ এবং ক্রুজের অপারেশন পরীা করার জন্য তিনি প্রায় ১৮ মাস ইংল্যান্ডে অবস্থান করেন। মেরামত, প্রশিণ এবং পরীা সফলভাবে শেষ হলে তা হস্তান্তর এবং দায়িত্বগ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছিল। ১৮ মাস পরে তাদের জাহাজটি পাকিস্তানের দিকে যাত্রা আরম্ভ করেছিল। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যকার অনুষ্ঠিত যুদ্ধেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাত থেকে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে রক্ষা করেন। তিনি ‘পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র পদক ১৯৫৬’, ‘তমঘা-ই-জাং ১৯৬৫’, ‘ক্লস্প-কাঁচ ১৯৬৫’ এবং ‘তমঘা-ই-খিদমত ক্লাস -১’ নামক কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পদক লাভ করেন।
সৈয়দ আব্দুল কাদির ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে একজন সামুদ্রিক প্রকৌশলী হিসেবে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)-এ যোগদান করেন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে একদল সমুদ্র ডাকাতদের বিরুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। এই অভিযানে তিনি এগারো জন ডাকাতকে ধরতে সক্ষম হন এবং তাদের কাছ থেকে প্রায় ৪০ লক্ষ (৪ মিলিয়ন) মূল্যের মূল্যবান মালামাল হস্তগত করেন। এছাড়াও তাঁর জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনুকরণীয় পারফরম্যান্সের জন্য তিনি বিএসসির সামগ্রিক সুপ্রিম এক্সিকিউটিভ কমান্ডের কাছ থেকে প্রশংসাপত্র অর্জন করেন। ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়াম তাঁর সামুদ্রিক জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিল্ম তৈরি করেছে যা গ্রিনউইচের একটি নতুন গ্যালারিতে সম্প্রচার করা হয়েছিল।
সৈয়দ আব্দুল কাদিরের ব্রিটিশ সংস্কৃতি, মানুষ এবং রাজ পরিবারের সাথেও ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। যখনই কোনো ব্রিটিশ রাজপরিবার বাংলাদেশে ভ্রমণ করতো তাকে সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হতো। তিনি ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ-এর রাজ্যাভিষেক পদক অনুষ্ঠানে সিলেটের গল্ফ কাব-এ আয়োজিত অনুষ্ঠানের রয়েল গেস্টদেরকে সম্মান প্রদর্শনার্থে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে একটি আমন্ত্রণপত্র পান। এই অনুষ্ঠানে রাজকীয় অতিথিবৃন্দ তাঁর আচরণে খুব বেশি মুগ্ধ এবং অভিভূত হন। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি রয়েল হাইনেস প্রিন্স ফিলিপ, অ্যাডিনবার্গের ডিউক অব রিসিপশন পার্টিতে আমন্ত্রিত হয়ে পুরো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। এই অনুষ্ঠানে প্রিন্স ফিলিপ তাকে একটি পদক উপহার দেন। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে রয়েল হাইনেস প্রিন্স চার্লস বাংলাদেশ সফরে এলে তাকে আবার আমন্ত্রণ জানানো হয়ের্ছিল। এভাবেই তিনি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দেশের আর্তসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে, ব্রিটেনে অবস্থানরত সিলেটবাসীর প্রতি ছিল তাঁর আন্তরিক টান।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ ডিসেম্বর সালেহা খানম চৌধুরী’র সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে হন। পারিবারিক জীবনে তাঁদের ছয় সন্তান। তাঁদের সন্তানরা হচ্ছেন – সৈয়দা শাহনাজ সুলতানা, সৈয়দ শাহজাহান কাদির (শাহজাহান), সৈয়দা ছালমা সুলতানা, সৈয়দ ইমরান আহমদ, সৈয়দ আহমদ সায়েম, সৈয়দা তানজিনা সুলতানা। তারা প্রত্যেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রিতিষ্ঠিত। সৈয়দ আব্দুল কাদিরের স্ত্রী সালেহা খানম চৌধুরী ২৭ মে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
সৈয়দ আব্দুল কাদির একজন সমাজসেবক ছিলেন। তিনি লন্ডনের টয়েনবি হলে যাওয়ার পর থেকে সেখানকার সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সুরমা সেন্টার’র একজন সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়া তিনি প্রবীণদেরকেও সমাজসেবায় সম্পৃক্ত করেন। তিনি সেখানে সমাজসেবায় তার বন্ধুদেরকে সমাজসেবী হতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশেষত সুরমা সেন্টারের মাধ্যমে সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। এমনকি তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার মধ্যে একটি সাহায্যের হাত বিদ্যমান ছিল যা তাঁকে সকলের কাছে একজন সজ্জন ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তিনি ‘সুরমা সেন্টার’র উন্নয়নে সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
সৈয়দ আব্দুল কাদির’র জীবন ও কর্ম এটাই প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন সমাজ ও দেশের জন্য একজন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। পাকিস্তান নৌবাহিনির চতুর্থ শ্রেণির প্রকৌশলী হওয়ার পর থেকে তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই আন্তরিকতা-নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তাঁর অসীম সাহসিকতা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সুস্পষ্ট অবস্থান বাংলাদেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। মূলত এদেশের মানুষের চিন্তা-চেতনায় তিনি আলোচিত না হলেও ইতিহাসে তিনি স্থান নেবেন স্বকীয়তায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশীর মধ্যেকার জাতিসত্তা রক্ষার তীব্র মনোবল সময়ে সময়ে জেগে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস। সৈয়দ আব্দুল কাদির’র জীবনপ্রভা সে জাগানিয়াকেই আশান্বিত করে তুলবে।
দুনিয়ার জগত হলো ক্ষণস্থায়ী। একদিন জগত নির্মূল নাশ হয়ে যাবে। পৃথিবী তার অস্তিত্ব হারাবে। পৃথিবীতে কোনো মানুষের চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে না। এই ধ্বংসশীল দুনিয়াতে মানুষও ধ্বংসশীল। আদম জাতিও ক্ষণস্থায়ী। একজন মুসাফির ভবঘুরে যেমন আপন ঠিকানাবিহীন পথ প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায়, তার চলতে পথে কোনো নির্ধারিত বাসস্থান থাকে না, তেমনি দুনিয়াতে মানবজাতির পরো কোন বাসস্থান নেই। যা আছে তা ক্ষণস্থায়ী। দুনিয়ার ময়দানে মানব হল মুসাফির। পৃথিবীর পথে সে হল বাউণ্ডুলে পথিক। তার হায়াতের নির্ধারিত সময়ের ভেতর পুঁজি সংগ্রহ করে পথ চলতে হবে। মুসাফির হয়ে পথের পাথেয় যোগাড় করতে হবে। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তিনি বলেন, রাসুল (সা.) আমার বাহুমূলে ধরলেন। তারপর বললেন, ‘দুনিয়াতে এভাবে কাটাও যেন তুমি মুসাফির বা পথিক’। হযরত ইবনে উমর (রা.) বলেন, যখন সন্ধ্যা হয়ে যায় সকাল বেলার অপেক্ষা করো না। আর যখন সকাল হয়ে যায় সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। সুস্বাস্থের দিনগুলোতে রোগব্যাধির প্রস্তুতি নাও। আর জীবদ্ধশায় থাকাকালীন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করো’। (বুখারি)
নশ্বর পৃথিবীর শাশ্বত চিরন্তন সত্য হলো মৃত্যু। মৃত্যুর চেয়ে অপরিবর্তনীয় অনড় শব্দ জগতের অভিধানে খুব কম। আখেরে সবাইকে জগত ছেড়ে পরপারে যেতে হবে এটা স্বাভাবিক। সুতরাং ধরার সব পাঠ শেষ করে ইসলামী জীবন ধারণ করে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণা বুদ্ধিমানের কাজ। সৈয়দ আব্দুল কাদির আপাদমস্তক একজন সত্যসন্ধানী ও পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবনে তিনি ইসলামী অনুশাসন মেনে চলতেন। পাশাপাশি নিজের সন্তান-সন্তুতি এবং স্বজন-সুজনদের সত্যের প্রতি অবিচল থাকতে অনুপ্রেরণা যোগাতেন। আমি এই গুণধর ব্যক্তিত্বের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন-আমিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক।