স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর শহিদ রশীদ আলী বীর প্রতীকের সমাধির সন্ধান পেল পরিবার
প্রকাশিত হয়েছে : ৪:৫৮:৩৩,অপরাহ্ন ২৬ জানুয়ারি ২০১৭ | সংবাদটি ১৭০৩ বার পঠিত
জুয়েল খান ।।
মুক্তিযুদ্ধে রশীদ আলী শহিদ হয়েছেন। এটা তাঁর পরিবারের সদস্যরা জেনেছিলেন এলাকার এক সহকর্মী সহযোদ্ধার কাছ থেকে। কিন্তু তারা জানতেন না, কোন সেক্টরে কখন কোথায় তিনি যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন।
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রশীদ আলীর স্বজরনা রশীদ আলীর কর্মস্থলসহ জানাশোনা লোকজনের মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে রশীদ আলী সম্পর্কে আশাবাদী হওয়ার মত কোন কোন খবর পেলেন না।
এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করলেও থেমে থাকেননি রশীদ আলী ভাইপো যুক্তরাজ্য প্রবাসী ছায়েদুল খালেদ। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধকালীন ইতিহাস ঘাটাঘাটি করে অবশেষে স্বাধীনতা সংগ্রামের ৪৫ বছর পর মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হওয়া সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বীরপ্রতীক ইপিআরের সুবেদার শহীদ রশীদ আলীর সমাধির সন্ধান পেয়েছেন তাঁর পরিবার।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁওয়ের বাসিন্দা ইউপিআরের তৎকালীন সুবেদার রশীদ আলী বীরপ্রতীক একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গার জেলার জীবননগর উপজেলার উতলী ইউনিয়নের এক রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন।
স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৫ বছর পর্যন্ত তাঁর পরিবারের লোকজন জানতেন না কোথায় তিনি শহীদ হয়েছেন, কোথায় তাকে সমাহিত করা হয়েছে। দীর্ঘ ৪৫ বছর পরিবারের সদস্যরা খুঁজে ফিরেছেন পরিবারের ওই শ্রেষ্ঠ সন্তানটির সমাধিস্থল।
অবশেষে ২০১৬ সালের শেষে দিকে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উতলি ইউনিয়নের ধোফাখালী হাট এলাকায় শহীদ রশীদ আলীর বীরপ্রতীকের সমাধিস্থল খুঁজে পায় তাঁর স্বজনরা।
শহীদ রশীদ আলীর বীরপ্রতীকের জন্ম ১৯৩১ সালের ১০ মে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁওয়ে। তাঁর বাবার নাম মৃত মনসুর আলী, মা মৃত করিমুন নেছা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে রশীদ আলী ছিলেন সবার বড়। তাঁর একজন মাত্র ছোটবোন প্রয়াত কমলা বেগম। ছোটভাই খুরশিদ আলীর পরিবার বর্তমানে মাইজগাঁয়ে বসবাস করছেন।
রশীদ আলী ১৯৫০ সালে তৎকালীন ইপিআর ৪নং উইংয়ের একজন সৈনিক হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) এ যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী অতর্কিত ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন ইপিআরের সদর দপ্তর পিলখানায় আক্রমণ করলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে ৮নং সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর (বীর উত্তম) নেতৃতে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করেন রশীদ আলী।
বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেন।
একজন অভিজ্ঞ ইপিআর সদস্য হিসেবে রশীদ আলী চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত এলাকায় তরুণ মুক্তি বাহিনী সদস্যদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতেন।
৭ আগস্ট ১৯৭১ সালে ৮নং সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোস্তাফিজুর রহমানের (বীরপ্রতীক) নেতৃত্বে বর্তমান চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার উতলি ইউনিয়নে এক সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে সুবেদার রশীদ আলীসহ ৫ জন শহীদ হন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালে তাকে শহীদ বীরপ্রতীক খেতাব প্রদান করে। শহীদ রশীদ আলীসহ ৫ জন শহীদকে চুয়াডাঙ্গার ধোফাখালী এলাকায় সমাহিত করা হয়।
শহীদ রশীদ আলীর বীরপ্রতীকের একমাত্র ছোটভাই খুরশীদ আলীর বলেন- “দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজি করেও আমরা বড়ভাইয়ের সমাধির কোন সন্ধান পাইনি। কোথায় থাকে কবর দেওয়া হয়েছে কিংবা আদৌ কবরস্থ করা হয়েছে কিনা আমরা জানতাম না। আমার ছেলে (ছায়েদুল খালেদ) খোঁজখবর নিয়ে রশীদ ভাইয়ের কবরস্থান বের করেছে।”
যুক্তরাজ্য প্রবাসী ছায়েদুল ইসলাম খালেদ বলেন- পাকিস্তানীদের পরাজয়ের দলিল হামিদুর রহমান কমিশন এবং চুয়াডাঙ্গার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইটি তাঁর চাচার কবর সনাক্তকরণে সহায়ক ছিল। আমরা পরিবারের সদস্য চুয়াডাঙ্গায় গিয়ে চাচার সমাধি শনাক্ত করি।