‘আফটার অল আমি একজন বাংলাদেশি। আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে হলেও আমি তো আমার গায়ের রং পরিবর্তন করতে পারব না, আমার রক্ত পরিবর্তন করতে পারব না। একজন বাঙালি মেয়ে হিসেবে আমি সব সময় গর্ববোধ করি। আর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আমার কাজের ক্ষেত্র ও সুযোগ বেড়েছে। বাংলাদেশ যে একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় দেশ—এটা বিশ্বের কাছে আমি তুলে ধরতে চাই। ’

বাংলাদেশ নিয়ে নিজের ভাবনা বিষয়ে কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাত্কারে এভাবেই নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করলেন যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি নারী মেয়র নাদিয়া শাহ। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে একসঙ্গে বাংলাদেশি তিন কন্যার ইতিহাস গড়ার পর গত বছর ১১ মে যুক্তরাজ্যের ক্যামডেন বরো কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। আর এর মধ্য দিয়েই যুক্তরাজ্যে প্রথম বাংলাদেশি নারী মেয়র হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান তিনি।

গত ১৫ জানুয়ারি ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে বাংলাদেশে আসেন নাদিয়া শাহ। ছয় দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে গতকাল শনিবার সকালে তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে যান। বাংলাদেশ সফরকালে নাদিয়া শাহ অর্থমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরও পরিদর্শন করেন। এ ছাড়া দুই দিন সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলা সফরকালে প্রশাসনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি মতবিনিময় করেন।

বাংলাদেশে প্রতিনিধিদল নিয়ে আসা সম্পর্কে জানতে চাইলে নাদিয়া শাহ বলেন, ‘বাংলাদেশে আসার কারণটি খুবই পরিষ্কার। আমি যেখানের নির্বাচিত মেয়র সেই ক্যামডেনে বড় মাইনরিটি গ্রুপ হচ্ছে বাংলাদেশি মানুষ, বিশেষ করে সিলেটি মানুষ। আমি আমার প্রতিনিধিদলকে দেখাতে চেয়েছি আমার দেশের যারা ওখানে থাকে তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি কী। এতে করে তাদের উপলব্ধির বিষয়টি আরো গাঢ় হবে বলে আমি মনে করি। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, দরিদ্রতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়গুলোও এই সফরের এজেন্ডায় রয়েছে। এ ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশে কিভাবে কাজ হচ্ছে একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে কী করা হচ্ছে তা তুলনামূলকভাবে পর্যবেক্ষণ করাও একটা উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে ভালো করছে, যা আমাদের কাজে লাগবে। একইভাবে আমাদের কর্মপদ্ধতিও এ দেশের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে শেয়ার করেছি। ’

বাংলাদেশ থেকে ব্রিটিশ ভিসা সেন্টার দিল্লিতে স্থানান্তর এবং ভিসাপ্রাপ্তিতে বাংলাদেশিদের জটিলতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাদিয়া শাহ বলেন, ‘আমি বাংলাদেশে আসার পরদিনই বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেকের সঙ্গে মিটিং হয়েছে। আমি সেখানে এই বিষয় তুলেছি। জানতে চেয়েছি এর কারণ কী? ভারত থেকে ভিসা আনতে হবে কেন? তিনি আমাকে বলেছেন, ব্যয় কমানোর জন্য এটা করা হয়েছে। তখন আমি তাঁকে বলেছি, প্রয়োজনে ব্যয় কিছু বাড়িয়ে হলেও এই সুবিধা আবার চালু করা দরকার। তাহলে বাংলাদেশের মানুষ সহজে ভিসা পেতে পারবে। তাদের দুর্ভোগে পড়তে হবে না। কিভাবে আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারি তা ভেবে দেখার জন্য তাঁকে বলেছি। ’ বাংলাদেশ সফরকালে এ বিষয়ে আরো অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে উল্লেখ করে নাদিয়া শাহ বলেন, বাংলাদেশে ভিসাকেন্দ্র ফিরিয়ে আনার বিষয়টি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উঠলে তাঁর দল সমর্থন জানাবে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ক্যামডেন বরো কাউন্সিলের টুইনলিংক স্থাপনের কোনো উদ্যোগ নেবেন কি না জানতে চাইলে মেয়র নাদিয়া শাহ বলেন, ‘অনেকেই আমাদের বলেছে সিলেট ও ক্যামডেন টুইনলিংক করার জন্য। আগে হয়তো (আমি শুনেছি) যুক্তরাজ্যের টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিল ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মধ্যে একটি পার্টনারশিপ প্রকল্প ছিল। কিন্তু যেকোনো কারণে সেটি এখন আর নেই। আমি আমার লিডার অব কাউন্সিলের সঙ্গে কথা বলেছি। কারণ আমি মেয়র আর তিনি আমাদের নেতা। তিনি বলেছেন, ভেবে দেখবেন বিষয়টিকে কিভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়। ’

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি নারীদের জন্য তিনি কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি না জানতে চাইলে নাদিয়া শাহ বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে অনেক কাজ করেছি। বাংলাদেশ থেকে যেসব নারী যুক্তরাজ্যে যায় তারা যদি ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারে তাহলে সেখানকার পরিবেশের সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। ভাষাগত দক্ষতা না থাকলে তারা পিছিয়ে পড়বে। আমি সব সময় এই বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কোন জায়গাগুলোতে গিয়ে তারা ইংরেজি শিখতে পারবে তারও পরামর্শ দিই। নতুন বউ দেশ থেকে যাওয়ার পর অনেক শাশুড়ি চান না সে বাইরে যাক। আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি, বউ ইংরেজিতে দক্ষ হলে আপনাদেরই সুবিধা হবে। ভবিষ্যতে তিনিও তখন কাজ করতে পারবেন। পরিবারে ভূমিকা রাখতে পারবেন। ’

বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং সমস্যা ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো কিভাবে মূল্যায়ন করেন কিংবা তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে মেয়র নাদিয়া শাহ বলেন, ‘আমরা যারা বাংলাদেশে থাকি না, বাইরের দেশগুলোতে থাকি, আমাদের প্রধান কাজ হলো নিজেদের পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষকেও ওপরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি বিশ্বাস করি, আমরা যদি এটা সফলভাবে করতে পারি এবং ওইভাবে এগিয়ে যেতে পারি তাহলে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সবাই সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। ’

বাংলাদেশ মাত্র ৪৫ বছর বয়সী একটা দেশ উল্লেখ করে এই নারী মেয়র বলেন, ‘অতীতে এই দেশ অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। অনেক দুঃখজনক রাজনৈতিক ঘটনাও ঘটেছ। এর পরও এখন বাংলাদেশ যে পর্যায়ে এগিয়ে চলেছে আমি সেটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি। কিন্তু সব ক্ষেত্রে ভালো সিদ্ধান্ত হতে হবে। বাণিজ্যকে আরো আকর্ষণীয় করতে হলে ১০-২০ বছর পরে বাংলাদেশ কী রকম হবে সেটা ভাবতে হবে। যারা বাংলাদেশে ব্যবসা করতে আসবে তাদের বোঝাতে হবে তারা এখানে অনেক বেশি লাভবান হবে, কিন্তু তাদের সঙ্গে যে চুক্তি হবে সেখানে উল্লেখ থাকতে হবে যারা যারা এখানে শ্রম দেবে তারা ন্যূনতম কিছু সুবিধা পাবে। নারীরা বিশেষ করে যারা গর্ভবতী তারা মাতৃকালীন ভাতা পাবে, তাদের কাজের পরিবেশ ভালো থাকবে—এসব নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। এসব গড়ে তুলতে হবে শুরু থেকেই। ’

বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে অনেক সম্ভাবনা আছে—এ কথা উল্লেখ করে নাদিয়া শাহ বলেন, প্রত্যাশিতভাবেই বাংলাদেশ খুব দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে যাবে। এ ছাড়া তথ্য-প্রযুক্তির উন্নতিসহ যেসব খাতে অর্থায়ন হচ্ছে তাতে করে এ দেশ আরো উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হবে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতির প্রশংসা করে নাদিয়া শাহ বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার অনেক কাজ করছে। বছরের প্রথম দিন বাচ্চাদের হাতে বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, এটা খুব ভালো দিক। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা দেশটাকে আরো উন্নত করতে পারে। ’

‘চাইল্ড পোভার্টি’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে নাদিয়া শাহ বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সেখানে শিশুদের দরিদ্রতা মানে এটা নয় যে ওখানকার শিশুদের খাবার বা কাপড় নেই কিংবা তারা নিরাপদ পানি পাচ্ছে না। এই সবই তাদের আছে। কিন্তু বাংলাদেশে দরিদ্রতা মানেই একটি শিশু কিভাবে বাঁচবে, কিভাবে খাবার পাবে তার নিশ্চয়তা নেই। তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনা আছে। সবাই মিলে যদি কিছু করতে পারি তাহলে আরো ভালো হবে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। ’

বাংলাদেশকে নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় বাংলাদেশি মূল্যবোধ লালন করি এবং আমার শিকড় নিয়ে আমি এক্সট্রিমলি গর্ববোধ করি। আমি লন্ডনে বসবাস করলেও আমি তো আমার ত্বকের রং পরিবর্তন করতে পারব না, আমার রক্ত পরিবর্তন করতে পারব না। সুতরাং আমি সব সময় গর্বিত একজন বাঙালি মেয়ে হিসেবে। ’

বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ—এ কথা উল্লেখ করে নাদিয়া বলেন, ‘এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ, ভাষা ও সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং নৈসর্গিক সৌন্দর্য অনন্য ও অতুলনীয়। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের একজন দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করব। বাংলাদেশ যে একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় দেশ এবং এই দেশ যে অন্যান্য দেশের জন্য রোল মডেল হতে পারে তা আমি তুলে ধরতে চাই। বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে আমার চেষ্টা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাব। এরই মধ্যে আমি সেই কাজ শুরুও করেছি। ’

ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করেন জানিয়ে নাদিয়া শাহ বলেন, ‘আমার বাবা সব সময় আমাদের বাংলা সংস্কৃতি ও ভাষা শেখাতে সচেষ্ট ছিলেন। একসময় শনিবার এলেই আমরা বলতাম, ইস্, আজ শনিবার, বাংলা ক্লাস করতে হবে চার ঘণ্টা। কিন্তু এখন আমি গর্বিত যে এখন আমি বাংলা বুঝি, পড়তে পারি এবং লিখতে পারি। ’

উল্লেখ্য, নাদিয়া শাহের জন্ম ও বেড়ে ওঠা লন্ডনে। চার বোনের মধ্যে নাদিয়া সবার বড়। তাঁর বাবার বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া শহরে এবং মায়ের বাড়ি সিলেট শহরে। নাদিয়ার বাবা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম প্রথম জীবনে ব্যাংকিং পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যবসায় যুক্ত হন। ষাটের দশকে তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়ে সেখানে ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। নাদিয়ার মা আম্বিয়া ইসলাম লন্ডনের একটি নার্সারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ব্যক্তিজীবনে নাদিয়া তিন সন্তানর জননী। তাঁর স্বামী জলিল শাহ একজন আইটি বিশেষজ্ঞ এবং ক্যামডেন কাউন্সিলের ইনফরমেশন টেকনোলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত। তাঁর গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার আশ্রাকাপন গ্রামে।

যুক্তরাজ্যে প্রথম বাংলাদেশি নারী মেয়র নাদিয়া শাহ

লন্ডনের পার্লামেন্ট হিল স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করেন নাদিয়া শাহ। পরে গ্রিনউইচ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজার হিসেবে ইংল্যান্ডের ন্যটওয়েস্ট ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর হোম অফিস, স্থানীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ২০১৪ সালে নাদিয়ার রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। লেবার পার্টির রাজনীতি করেই তিনি ক্যামডেন বরো কাউন্সিলের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে তিনি ডেপুটি মেয়রও নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর গত বছর ১১ মে যুক্তরাজ্যের ক্যামডেন বরো কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচিত হন নাদিয়া শাহ।

সৌজন্যে কালের কন্ঠ।