লকডাউন ভেঙ্গে হাওরে জনস্রোত, পদদলিত কৃষকের হাঁসি!
প্রকাশিত হয়েছে : ৯:১৫:২৪,অপরাহ্ন ২৯ এপ্রিল ২০২০ | সংবাদটি ২৯৭৭ বার পঠিত
সুনামগঞ্জ থেকে সংবাদদাতা:: করোনাভাইরাস সংক্রামক ঠেকাতে বিশ্বের প্রায় সকল দেশের মানুষ এখন ঘনবন্দি। দেশে দেশে বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা।
বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশের মানুষও সরকারী নির্দেশনা মেনে রয়েছেন ঘরবন্দি। এমনকি পবিত্র রমজানে আল্লাহর ঘর মসজিদে নামাজ আদায়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে রয়েছে কড়াকড়ি। ঠিক তখনই সিলেটের হাওরাঞ্চল খ্যাত সুনামগঞ্জে ঘটলো ব্যতিক্রমী এক কান্ড।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) সুনামগঞ্জ হাওরে ধানকাটা পরিদর্শনে আসেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক।
মন্ত্রীকে এক নজর দেখতে দলে দলে হাওরে ছুটে আসেন ঘরবন্দি মানুষজন। এখানে মানা হয়নি কোন রকমের দূরত্বতা।
কিন্তু গত কয়েকদিন থেকে সুনামগঞ্জে বেশ কয়েকজনের শরীরে করোনাভাইরাম ধরা পড়েছে। এমনকি কয়েকদিন আগে পুরো জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। মন্ত্রী আসায় লকডাউন বা দূরত্ব কিছুই চোখে পড়েনি প্রশাসনের। এখানে তারা ছিলো নির্বিকার।
শুধু কৃষিমন্ত্রী নয় সুনামগঞ্জের কৃতিসন্তান পরিকল্পনামন্ত্রী আব্দুল মান্নানও এসময় ছিলেন হাওরে। কিন্তু তিনিও কোনভাবে আটকাতে পারেননি মানুষের বাঁধ।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ায় মানুষের জোয়ারের ছবি ভাইরাল হলে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। বিশেষ করে সুষিল ও আলেম সমাজ সরকারের নীতি নির্ধারকদের কান্ড জ্ঞান নিয়ে ঝড় তুলেছেন।
তারা বলছেন, লকডাউনের শুরুতে ইন্তেকাল করেন হাফিজ মাওলানা যোবায়ের আহমদ আনসারী। তিনি বাংলার ধর্মপ্রাণ সকল মানুষের একজন শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। কোন রকমের ঘোষণা ছাড়াই উনার জানাযায় লোকসমাগম হয়ে গিয়েছিল। তা দেখে একশ্রেণীর মাথামোটা লোক আলেম সমাজ ও আনসারী ভক্তদের নিয়ে নানা মন্তব্য করে। যা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হৃদয়ে রক্তকরণ হচ্ছে। এছাড়া গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে আরও কয়েকজন আলেম ইন্তেকাল করেছেন। লকডাউনের অজুহাতে তাৎক্ষনিক তাদের জানাযা সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়া হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
কিন্তু হাওর পরিদর্শনে আসা মন্ত্রীকে একনজর দেখতে হাজার হাজার মানুষ রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারক ও প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের সামনে একত্রে জড়িত হলো, তানিয়ে কেউ কোন মন্তব্য করতে দেখা যায়নি।
শুধু তাই নয়, হাওরে মন্ত্রীর আগমনে উৎসুক জনতার পায়ের নীচে পদদলিত হয়েছে অনেক কৃষকের মুখের হাঁসি। বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে সোনালী ধানের হাতছানি। তার উপর উৎকুণ্ঠিত কৃষককুল। কৃষকরা প্রনোদনা পাবার আশায় যখন উদগ্রীব-ঠিক সেই সময়ে কৃষিমন্ত্রী আসলেন হাওর পরিদর্শনে। ফলে হাল ভেঙ্গেই যাত্রা শুরু উৎসুক মানুষের। মাঠের পর মাঠ পাকা ধান ক্ষেতের উপর দিয়ে সবাই পৌছলেন দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ঢংরিয়া গ্রামের সাংহাই হাওরে। সবাই সেখানে দেখলেন অপূর্ব দৃশ্য! মন্ত্রী নিজ হাতে কাস্তে নিয়ে শুরু করলেন ধান কাটা। কিন্তু দৃশ্যটি আনন্দের হলেও এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে মাঠের অনেক পাকা ধান। মানুষের পায়ের চাপে মাটিতে নুয়ে পড়ে ধানের শীষ। নষ্ট হয় কৃষকের স্বপ্নমোড়া সোনালী ফসল।
এমনকি মন্ত্রীর আগমনে এসময় স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভিড়ে সামাজিক দূরত্ব সঠিকভাবে মানা হয়নি। মন্ত্রীদের হাওরের ধান কাটা পরিদর্শন দেখতে আশপাশের বসতি থেকেও লোকজন আসায় বেশ জনসমাগম হয়। এসময় উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীরাও মানেননি সামাজিক দুরত্ব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধান কাটার ছবি ভাইরাল হলে অনেকেই ছবি নিচে কমেন্টে করেন, এযেন পাকা ধানে মই দেয়া হচ্ছে।
হাওরে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্য বারবার হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দিলেও উৎসুক জনতা তা মেনে চলেননি।
ফলে সামাজিক দূরত্বের নিশ্চিতের বিষয়টি না মেনে উপস্থিত লোকজন একত্র হয়ে পড়েন। এছাড়া তখন সাধারণের ভিড়ে ধান নষ্ট হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
সিভিল সার্জন মো. শামছ উদ্দিনের মন্তব্য জানতে চাইলেও তিনি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত না করে হাওরে ধান কাটার প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক দাবি করে বলেন, আমরা সামাজিক দূরত্ব মেনে হাওরে ধান কাটতে যাই। কিন্তু জনগণ সে দূরত্ব রক্ষা করতে পারেননি। তারাও আমাদের সঙ্গে হাওরে ধান কাটতে চলে এসেছে। তারা যেভাবে পারছেন সেভাবেই ধান কাটতে এসেছেন। সংবাদকর্মীরাও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলেননি।
তিনি আরও বলেন, হাওরের কৃষক, মজুর মন্ত্রীদের দেখতে তাদের কথা শুনতে আগ্রহ নিয়ে মাঠে এসেছেন। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণের জন্য চেষ্টা করা হয়েছে তারপরও পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। আমরা যারা ধান কাটতে ছিলাম তারা সামাজিক দূরত্ব মেনে ছিলাম আমাদের সঙ্গে স্থানীয়রা এসে যোগদান করেন।






