রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত ইতিহাসসন্ধানী লেখক ফারুক আহমদ
প্রকাশিত হয়েছে : ৫:৩৬:৪৭,অপরাহ্ন ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | সংবাদটি ৪২২ বার পঠিত
আমাদের প্রতিদিন, সিলেট প্রতিনিধি:
ভূগোল বদলায়, ঠিকানা বদলায়—কিন্তু ইতিহাসের দায় বদলায় না। প্রবাসের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও যিনি অবিচলভাবে অনুসন্ধান করে চলেছেন বাঙালির স্মৃতি, শিকড় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার—তিনি লেখক ও গবেষক ফারুক আহমদ। দীর্ঘ চার দশকের সাধনা ও গবেষণার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে সিলেট জেলা প্রশাসন তাঁকে প্রদান করেছে ‘প্রবাসী সম্মাননা–২০২৫’।

গত ২৭ ডিসেম্বর সিলেট নগরীর কবি নজরুল ইসলাম অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মাননা প্রদান করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব আব্দুন নাসির খান। জেলা প্রশাসক মো. সরওয়ার আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ব্যক্তিগত কারণে ফারুক আহমদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও তাঁর প্রতিনিধির মাধ্যমে গ্রহণ করা হয় এই সম্মাননা—যা বহন করে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা ও সৃজনশীল শ্রমের স্বীকৃতি।
১৯৬৪ সালের ২২ জানুয়ারি সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার গোয়াসপুর গ্রামে জন্ম ফারুক আহমদের। পিতা কুতুব আলী ও মাতা তেরাবুন্নিসা খানম। গ্রামীণ শৈশবের লোকজ ভাষা, মানুষ ও স্মৃতি তাঁর মানস গঠনে গভীর ছাপ ফেলে। রায়গড় দ্বিতীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এমসি অ্যাকাডেমি গোলাপগঞ্জ এবং সিলেট মদন মোহন মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপেই তিনি লালন করেছেন পাঠ ও চিন্তার অভ্যাস।
সত্তরের দশকের শেষভাগে সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে তাঁর লেখালেখির সূচনা। আশির দশকের শুরুতে যুক্ত হন সাংবাদিকতায়। সাপ্তাহিক দেশবার্তা ও সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠ পত্রিকায় মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু হয় সময় ও সমাজ পর্যবেক্ষণের বাস্তব অভিজ্ঞতা। পরবর্তীতে দেশ-দুনিয়া, খেদমত, গোলাপ দর্পণ ও সুচয়নসহ একাধিক সাময়িকীতে সহ-সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। নব্বইয়ের দশকে লন্ডন থেকে প্রকাশিত লন্ডন বিচিত্র পত্রিকার অন্যতম প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে তিনি প্রবাসী বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সংগঠিত কণ্ঠ দেন।
পেশাগতভাবে শিক্ষক হলেও ইতিহাসচর্চাই হয়ে ওঠে তাঁর মূল সাধনা। রাণাপিং আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি গোলাপগঞ্জ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও কুতুব আলী গোয়াসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান আজও এলাকার মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

১৯৮৯ সালে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের আমন্ত্রণে যুক্তরাজ্যে আগমন ফারুক আহমদের জীবনে নতুন অধ্যায় সূচনা করে। লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও বাংলা ভাষা ও ইতিহাস থেকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী সদস্য, সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ যুক্তরাজ্যের দুই মেয়াদের সভাপতি এবং ‘অ্যাথনিক মাইনোরিটিজ অরিজিনাল হিস্ট্রি অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’ (ইমোহার্ক)-এর জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে তিনি প্রবাসে বাঙালির ইতিহাস সংরক্ষণে অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছেন।
ফারুক আহমদের গ্রন্থসমূহ প্রবাসী বাঙালির জীবন, সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বিলাতে বাংলা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা, বিলাতে বাংলার রাজনীতি, বিলাতে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা, বিলাতে বাঙালি অভিবাসন এবং সাম্প্রতিক সিলেটের ইতিহাস: ব্রিটিশ আমল—প্রতিটি গ্রন্থেই ইতিহাসের নির্ভুলতা ও সাহিত্যিক সংবেদন একসূত্রে মিশে আছে।
এই গবেষণামূলক ইতিহাসচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে তিনি লাভ করেন বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখক পুরস্কার। আর ‘প্রবাসী সম্মাননা–২০২৫’ যেন তাঁর দীর্ঘ পথচলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
ফারুক আহমদের জীবন ও কর্ম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রবাস মানে বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং দূরত্ব থেকেই শিকড়কে নতুন করে আবিষ্কার করা। তাঁর কলমে ইতিহাস কেবল অতীত নয়, তা হয়ে ওঠে জীবিত স্মৃতি।





