আনোয়ার শাহজাহান : সৃজনে ও মননে আদর্শবান
প্রকাশিত হয়েছে : ৭:০৯:৩৭,অপরাহ্ন ১৩ মার্চ ২০২১ | সংবাদটি ১৫৩২ বার পঠিত
আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল
মানুষের কল্যাণে কাজ করাই হচ্ছে আদর্শ মানুষের কাজ। যারা মানুষের জন্যে কাজ করেন, বিপদে আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ান তাদেরকে আমরা ভালো মানুষ বলি। কেবল বলিই না, মন-প্রাণ থেকে তাঁদেরকে শ্রদ্ধা করি। অন্তরের অন্তস্থল থেকে দোয়াও করি। তাঁদের প্রতি শুভকামনা জানাই। আমাদের সমাজে কিছু মানুষ আছেন, যারা মানুষের জন্য কাজ করে আনন্দ পান, শান্তি পান। তাঁদের তৃপ্তি মানুষের সুখে এবং আনন্দে। এমনই একজন হলেন লেখক, সাংবাদিক ও শিক্ষানুরাগী আনোয়ার শাহজাহান। তার জম্ম সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের রায়গড় গ্রামে এবং বেড়ে ওঠা সেখানেই।

আনোয়ার শাহজাহান পড়ালেখা করার সময়েই জড়িয়ে পড়েন সমাজসেবামূলক কাজে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে তার নিজ গ্রামের সমবয়সীদের নিয়ে গড়ে তুলেন সামাজিক সংগঠন ‘রায়গড় অগ্রগামী যুব সংঘ’। ১৯৯০ খিস্টাব্দ থেকে প্রাথমিক ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়ায় উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যেই চালু করেন প্রাথমিক বৃত্তিপরীক্ষা পদ্ধতি। এতে উপজেলার পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবীদেরকে বৃত্তি প্রদান করতেন। পাশাপাশি পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে উৎসাহিত করতেন। পরবর্তীকালে ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে জীবন জীবিকার তাগিদে ব্রিটেন চলে গেলেও সেখানে অবস্থান করেও ভাবতেন এলাকার মানুষদের কথা। এসব সহজ সরল মানুষদের জীবনমান উন্নয়ন ও পরবর্তী প্রজন্মের উজ্জল ভবিষ্যৎ গড়তে একান্তই মাটির টানে ফিরে আসেন শিকড়ে। স্বপ্ন দেখেন একটি আদর্শ স্কুল গড়ার।
সিলেট জেলার, গোলাপগঞ্জ উপজেলার সবুজ ছায়া ঘেরা শান্ত একটি গ্রাম ধারাবহর। একবিংশ শতাব্দিতে এসেও এই গ্রামের অনেক পরিবার আধুনিক সকল সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি শিক্ষা দিক্ষায় অনেক পিছিয়ে। এটা শুধু ধারাবহর গ্রামের চিত্র নয়। বাংলাদেশের শতকরা পঁচানব্বই ভাগ গ্রামেরই এই অবস্থা। শহরের মত উন্নয়নের ছোঁয়া এখনো লাগেনি গ্রামাঞ্চলে।
ধারাবহর গ্রামের কিছু সংখ্যক অনগ্রসর জনগোষ্ঠিকে জ্ঞানের আলোয় দিক্ষিত করে সামনে নিতে বহুমুখী ভাবনার পাশাপাশি নানাবিধ কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে থাকেন আনোয়ার শাহজাহান। তিনি এলাকার কিছু শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের চিন্তা করে তাদেরকে নিয়ে শুরু করেন তার স্বপ্নের স্কুল গড়ার কাজ। নিজের ঐকান্তিক চেষ্টা ও এলাকার সকল শ্রেণীর মানুষের সহযোগীতায় গড়ে তুলেন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নাম দিলেন আনোয়ার শাহজাহান একাডেমি।
আনোয়ার শাহজাহান নিজ প্রচেষ্টায় খোলামেলা জায়গায় মনোরম পরিবেশে স্কুলের অবকাঠামো তৈরীর পর শুরু হলো ছাত্র সংগ্রহ ও অভিভাবকদের বুঝানোর কাজ। যদিও কাজটি ছিল খুবই জটিল তবুও তিনি মেধা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জয় করলেন মানুষের মন। মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে অভিভাবকদেরকে বুঝাতেন, ছেলেমেয়েদের দীর্ঘ পথচলা সুন্দর আর সুগম করতে হলে লেখাপড়ার বিকল্প নেই।
২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক ভাবে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিকে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন সিলেট বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার ডক্টর জাফর আহমদ খান, গোলাপগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান হুমায়ুন ইসলাম কামাল, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নাজিরা বেগম শিলা, ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মজির উদ্দিন চাকলাদার, কথা সাহিত্যিক ও গীতিকার রুহুল আমিন রুহেল, সাংবাদিক মতিয়ার রহমান চৌধুরী, সাংবাদিক অজামিল চন্দ্র নাথ, ইমরান আহমদ প্রমুখ। আরো উপস্থিত ছিলেন আনোয়ার শাহজাহানের পিতা আব্দুল মুতলিবসহ পরিবারের সকল সদস্যবৃন্দ। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে গোলাপগঞ্জ তথা সিলেট পিছিয়ে থাকবে তা কারো কাম্য নয়। গোলাপগঞ্জের কৃতি সন্তানেরা সব সময়ই দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আমাদেরকে গর্বিত করেছেন। শুধু দেশে নয়, গোলাপগঞ্জের কৃতি সন্তানেরা বহির্বিশ্বে বিভিন্ন সম্মানজনক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্কুল প্রতিষ্ঠার পর আনোয়ার শাহজাহান, স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি আনোয়ার হুমায়ূনসহ স্কুলের শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের বুঝিয়ে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাত্র ৪২ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে প্রথমবারের মত শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে শুরু করেন স্কুলের পথ চলা। ৪২ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে বেশীর ভাগই ছিল অবহেলিত ও দিন মজুর পরিবারের সন্তান। এদেরকে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে পর্যন্ত ভর্তি করলেন। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় প্রথম অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায় এ স্কুল। আর তাতেই শতভাগ সাফল্য অর্জন করে বিদ্যালয়টি।
এ সাফল্যের সংবাদে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। আনোয়ার শাহজাহান প্রাথমিক বিদ্যালয় (সরকারী নীতিমালার জন্য নাম পরিবর্তন করে রাখলেন আনোয়ার শাহজাহান প্রাথমিক বিদ্যালয়) কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে যোগ্য ও মেধাবী করে গড়ে তুলতে এবং একটি মডেল স্কুল হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। এ ফল তারই বহিঃপ্রকাশ। সংবাদটি জাতীয় সংবাদপত্র ও পোর্টালে গুরুত্ব সহকারে পরিবেশিত হয়।

শুধু তাই নয়, শুরু থেকে অদ্যাবধি উপজেলায় ভালো ফলাফল অর্জনে উপজেলার প্রাথমিক স্কুল গুলোর মধ্যে একটি স্কুল হল আনোয়ার শাহজাহান প্রাথমিক বিদ্যালয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা মেধার বিকাশ ঘটাতে থাকে। শিক্ষার মান বৃদ্ধিকল্পে স্কুলের শিক্ষা পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটানো হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই মেধা খাটিয়ে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারছে।
প্রতিষ্ঠাতা আনোয়ার শাহজাহানের উদ্যোমী কর্মকান্ড এবং সাহসী পদক্ষেপে প্রতিষ্ঠানটি অতি অল্প সময়েই অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করে। তিনি তার মেধা পরিশ্রম ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জয় করতে সক্ষম হন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, প্রশাসন, সর্বোপরি সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মন।
আনোয়ার শাহজাহান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বাবলম্বী পরিবারের পাশাপাশি দরিদ্র দিনমজুর পরিবারের শিশুরাও পড়ালেখা করে। এই দরিদ্র পরিবারের সুবিধা বঞ্চিত মেধাবী ছেলে-মেয়েদের সহ সকল সম্প্রদায়ের অতিদরিদ্র মেধাবী সন্তানদের ঝরে পড়া রোধ করে সুষ্ঠুভাবে শিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি তার প্রতিষ্ঠানে যাবতীয় সুযোগ সুবিধা প্রদান করেন।
বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষা বান্ধব পরিবেশ, লেখা পড়ার মান নিশ্চিতকরণ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে স্কুলটি সফলতার সাথে এক যুগ পেরিয়ে গেছে। শিক্ষক, শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের নিয়ে সমন্বিত মতবিনিময় এবং তাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও মতামতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলায় এলাকাবাসীর নজর কাড়ে। এলাকাবাসীরাও এগিয়ে আসেন।
শুধু স্কুল পরিচালনা করেই তিনি ক্ষান্ত হননি। স্কুল পরিচালনার পাশাপাশি তাকে এলাকায় বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা ও সবসময় দরিদ্র মানুষের পাশে এসে সেবায় নিজেকে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে গোলাপগঞ্জের লক্ষিপাশা ইউনিয়নে মুরাদিয়া সুবুরিয়া হাইস্কুলে জমি দান করে স্কুলের দাতা সদস্য হন। তিনি অনেক গুলো শিক্ষা ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। আনোয়ার শাহজাহানের উদ্যোমী কর্মকান্ড এবং সাহসী পদক্ষেপ আমাদের এলাকায় খুব লক্ষণীয়।
আনোয়ার শাহজাহান তার জন্মস্থানকে ভালবাসেন। তাই এলাকার মেহনতি মানুষের আগামী প্রজন্মের সন্তানদের জন্য ভাল কিছু করার স্পৃহা সবসময় মনকে জাগিয়ে রাখে। সে চিন্তা-চেতনায় তিনি স্কুলটি গড়ে তুলেন। তিনি জীবনে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিতে জীবনে গতি থাকতে হবে। গতির পাশাপাশি চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিশ্রম ও ভালবাসা মানুষকে বাঁচতে শেখায়।
আনোয়ার শাহজাহান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিবছর মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের পুরস্কৃত করা হয়। শুধু তাই নয় ছাত্র ছাত্রীদের স্কুল ড্রেস, কলম, কাগজ সহ অনেক পরিবারকেও সাহায্য সহযোগিতা করা হয়। এর একমাত্র কারণ- তাদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানো। স্কুল পরিচালনার কমিটির সভাপতি হিসেবে স্কুলের শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁর ছোট ভাই আনোয়ার হুমায়ূন দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় লেখা-পড়ার মান ও অভিভাবকদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও মতামত সবসময়ই গ্রহণ করছেন। স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ এবং প্রবাসী নেতৃবৃন্দ বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনে সকলেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ এবং প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল দেখে প্রশংসা করেছেন।
আনোয়ার শাহজাহান শুধু নিজ নামেই স্কুল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। তিনি ২০১০ খ্রিস্টাব্দে লক্ষিপাশা ইউনিয়নের মুরাদিয়া ছুবুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ১২ শতক ভূমি ক্রয় করে দান করেন। তার এই দানের জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ আনোয়ার শাহজাহানকে আজীবন দাতা সদস্যদের তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি সংবর্ধ না প্রদান করে।
উল্লেখ্য মুরাদিয়া ছবুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়” লক্ষিপাশা ইউনিয়নের সবচেয়ে প্রাচীনতম উচ্চ বিদ্যালয়। এটি ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা আসাম প্রদেশের তৎকালীন মন্ত্রী মৌলভী আব্দুর রশিদ চৌধুরী যিনি লক্ষীপাশার কৃতিসন্তান। পরবর্তীতে ছবুর চৌধুরীর অর্থায়নে এটি বড় আকারে স্থাপন করা হয়। হজরত শাহজালালের সহযোগী হযরত মুরাদ (রহঃ) এবং ছবুর চৌধুরীর নামের সাথে মিল রেখে স্কুলের নামকরণ করা হয় “মুরাদিয়া ছবুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়”।
আনোয়ার শাহজাহান তার মেধা, শ্রম, সাধনা, ধৈর্য, দূরদর্শী মনোভাব, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার মাধ্যমে সমাজসেবামূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে আর্ত- মানবতার সেবায় নিয়োজিত রেখেছেন। তিনি নিজ এলাকার মানুষের কল্যাণ কাজ করছেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নও করেছেন। তিনি নিজের স্বার্থের চেয়ে অন্যের কল্যাণ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আমি আনোয়ার শাহজাহানের সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করছি।
লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক।
১২ মার্চ ২০২০, লন্ডন।






