ড. আব্দুল আজিজ তকি ।।

‘গোলপগঞ্জের ইতিহাস’ বইটি এখন আমার হাতে। বেশ আনন্দ চিত্তে পড়লাম। আমার বাড়ি ও জন্মস্থান গোলাপগঞ্জ বিধায় স্বাভাবিকভাবেই বইটি পড়ার একটা বাড়তি উৎসাহ ছিল। অনেক জানা অজানা, তথ্য-উপাত্ত নিয়ে লিখা গোলাপগঞ্জের ইতিহাস। প্রচুর পরিশ্রম, গবেষণা ও অধ্যবসায়ের ফসল এই বইটি। এমন দূরূহ কাজ করতে কতটুকু মাথার ঘাম ঝরাতে হল তা একমাত্র লেখকই বলতে পারবেন। এ ধরনের বইয়ের আলোচনা-সমালোচনা যত সহজে করা যায় তত সহজে এমন একটি বই যে তৈরি করে পাঠকের হাতে তুলে দেয়া যায় না তা সর্বজনবিদিৎ। এই গ্রন্থটি হাতে তুলে নিতেই বুকটা আনন্দে ভরে গেছে। আমার বিশ্বাস এমন একটা মহৎ কাজ করে ফারুক আহমদ গোলাপগঞ্জবাসীকে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করলেন। প্রথমেই ফারুক আহমদকে বুকভরা অভিনন্দন। জন্মস্থানের প্রতি যে টান এই বইটির প্রতিও আমার সমান কদর থাকবে। কারণ, গোলাপগঞ্জকে নিয়ে এমন তথ্যভিত্তিক বই আর দ্বিতীয়টি নেই। কালের গর্ভে যে কত কালজয়ী কলরব লুপ্ত রয়েছে এই বইটা পড়লে সহজে বুঝা করা যায়। ‘গোলপগঞ্জের ইতিহাস’কে সযত্নে নিজের সংগ্রহে রেখেছি এবং সাথে সাথে আপনাদেরকেও বলবো পারলে বইটা পড়বেন, সংগ্রহে রাখবেন, আরো দশ পাঁচজনকে পড়ার পরামর্শ দেবেন। বুকে হাত রেখে বলতে পারি এ বইটি কিনে নিলে কেউ ঠকবেন না।

 

আমি কিন্তু বইটির সমালোচনা লিখতে কলম ধরিনি। গবেষণার উপাসনা করবো এমন চিন্তা নিয়েও বসিনি। কারণ, প্রথমত বই-পুস্তকের সমালোচনা করার মত বিদ্যা আমার পেটে নেই। দ্বিতীয়ত যারা সমালোচনা করেন তারা বইয়ের মলাট, প্রচ্ছদের রঙরূপসহ অন্দর-বাহির ইত্যাদি নিয়ে যে ভাবে আলোচনা করতে পারেন এ সবকিছুর বারান্দা পর্যন্ত আমি এখনো পৌঁছতে পারিনি। তৃতীয়ত গবেষণালব্ধ এমন জ্ঞান এখনো সঞ্চয় করতে পারিনি যে গবেষণামূলক কাজের সমালোচনা করবো। তবে হ্যাঁ, পাঠক হিসেবে পাঠ্যবিষয়ের নান্দনিকতা নিয়ে আলাপ করতে দোষের কিছু নেই। লেখকরাও মুখবদ্ধে সে আহবান করে রাখেন। তা ছাড়া জন্মস্থানের ইতিহাস সম্পর্কে কথা বলার সামান্য বাড়তি অধিকার আমি রাখতেই পারি। এই ইতিহাসইতো আমাকে জানিয়ে দিচ্ছে আমার অবস্থানের কথা,আমার নাড়ির সম্পৃক্ততার কথা।

 

বইটা নিয়ে যখন বলতে লেগেছি তখন যথসামান্য পর্যালোচনা না করলে ভাল দেখায় না। ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস’ নামটা যখন দেয়া হয়েছে তখন বলে রাখা ভাল যে, ইতিহাসের মাপযন্ত্র দিয়ে অংক কষে এই বইটাকে বিচার-আচার না করে এর সামগ্রীকতা নিয়ে কথা বলা ভাল। আমি এমনটি করিনি। কারণ, ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার বলেছেন- ‘ইতিহাস চর্চার উদ্দেশ্য সত্যের আবিষ্কার ও উদ্ধার। এ সত্য নিত্য এবং গুপ্ত সত্য নয়, অনিত্য এবং লুপ্ত সত্য’। গোলাপগঞ্জের ইতিহাস পড়লে আপনি অনিত্য এবং লুপ্ত সত্যের সাথে নিত্য ও গুপ্তের ছোঁয়া পাবেন। ইতিহাসের গবেষণা তখনই স্বার্থক হয় যখন পাঠক পাঠ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়ান, নিজের মনে যুক্তি তর্ক না বাঁধিয়ে অতিতের কোন এক যায়গায় নিঃসংকোচে নিজেকে নিয়ে যেতে পারে। কিংবা মাঝেমধ্যে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে নিজেকে ভুলে যেতে পারেন। কখনো দু’ফোটে চোখের জল ছেড়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও নিজেকে দাঁড় করান বহু যুগ যুগান্তরের পাশে। সে কারণে ইতিহাসে লেখককে অন্যের স্বাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে ইতিহাস বলতে হয়, না হলে এটা ইতিহাস না হয়ে আত্ম কথা অথবা আত্মজীবনী হয়ে যায়।

 

সত্যি বলতে কি, গোলাপগঞ্জের ইতিহাস পড়ে আমি আনন্দে উৎফুল্ল হয়েছি, অতিতে ডুব দিয়েছি, নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। আমি জানি এটা কোন কেতাবি (ধপধফবসরপ) গবেষণা নয়, তারপরও বলবো গবেষণা পর্বগুলো কিন্তু কেতাবি গবেষণার চেয়ে কোন অংশে কম নয়, অংশ বিশেষের উপস্থাপনা অতি চমৎকার। আপনি বলবেন – নিত্য দিনের কিছু বিষয়াশয়ের সংযোজন গ্রন্থটির সেই সম্মানটাকে কিছুটা খর্ব করেছে, ইতিহাসে কখনো প্রয়োজনের বেশি বলতে নেই। মতামত দিতে গেলে মিথ্যা বলবো না, মাঝেমধ্যে অনিত্য ও লুপ্ত বিষয়ের সাথে নিত্য কিছু বিষয়ের সংমিশ্রন দেখে নিজেও থমকে দাঁড়িয়েছি তারপরও যুক্তিতর্কের যাতাকলে নিজের কল্লাটাকে কাত করে দেইনি। কেনইবা দেব! নিজে যে কাজ করার সাহস পাইনি অন্যজন সে কাজটি করে দিলে, করতালি দিয়ে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান উচিৎ। ভাল-মন্দ সেতো পরের কথা। কত কাটখড় পুড়িয়ে, আমার গৌরব আর গর্বের কতকিছু বুকে পেটে ধারণ করে ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস’ আমার ঘরে পৌঁছেছে। এর চেয়ে বড় পাওয়ার আর কি থাকতে পারে। সুতরাং এই বইটি আমার কাছে ‘আলালের ঘরের দুলাল’।

 

চলুন এবার বইটির অন্তরাত্মা নিয়ে নিজের মনের দু’চারটা কথা বলি। না হলে আপনি মনে করবেন নিজে না পড়ে অযতাই গুলতানি মারছি। বিশ্বাস করেন গ্রন্থটি নিজে পড়েছি এবং আরো পড়বো। আশ্বস্থ করার জন্য চোখে লেগেছে এমন কিছুটা উদাহরণ এখানে দিলাম। বইটির ১০৯ পৃষ্ঠার ৯ নং লাইেনে ‘আইসিএস পা করলেও’ লেখায় ‘পা’-এর সাথে ‘শ’ বাদ পড়েছে। একই পাতার শেষ লাইনের উপরের লাইনে ‘জিন্নাহ লন্ডনে তার পুরনো পেশায় ফিলে গেলেও’ ‘ফিলে’ টা হবে ‘ফিরে’। ২৬৭ নম্বার পাতায় আতাউর রহমান সাহেবের পরিচিতিতে ‘ঢাকা ঢাকা ইউনিভার্সিটি’ লেখা। কোন কোন যায়গায় ‘ব্যবহারজীবী ’ লেখা হয়েছে। শব্দটার ব্যবহার খুব একটা চোখে বাজে না। বিকল্প ব্যবহারিক শব্দ যেমন ‘আইনজীবী’, ‘আইনব্যবসায়ী’, ‘উকিল’, এমনকি ‘এ্যাডভোকেট’ কিংবা ‘ব্যারিস্টার’ বলাতেও কোন অসুবিধা ছিলনা। এই শব্দগুলোর জনপরিচিতি অত্যন্ত ব্যাপক। এভাবে ভূমিকাতে কয়েকবার লেখক ‘আমি’-এর যায়গা ‘আমরা’ ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা কেন মনে করলেন বোঝা গেল না। মাঝেমাধ্যে এমনি দু’-একটা ছাড়াছাড়ি ঘটেছে, ছাপার ক্ষেত্রে এমনটি স্বাভাবিক, তবে তুলনামূলকভাবে খুব কম।

 

আমার একান্ত নিজের কথাটা বলি। পূর্বসূরিদের (যারা ইতিহাসের অংশ) সাথে ইদানীং কিছু রাজনীতিবিদ, লেখক ও সাংবাদিকদের একই পাল্লায় তুলে দেয়া দৃষ্টিনন্দন বলে মনে হয়নি। তসাদ্দুক আহমদ আর আজিজ তকির কাজকামের পরিসর আর জন-সম্মানের যায়গাগুলোতে দেদার দূরত্ব। গবেষণা কাজে সে দূরত্বটা চিহ্নিত করা উচিৎ। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমি, তুমি, তিনি সকলেই আসতে পারি তাতে দোষের কিছু নেই, তবে সেই আসাটা হতে হবে স্থান-কাল-পাত্রের ভেদবিচারে।

 

পাঠক প্রশ্ন তুলতে পারে, আমি কেন উপস্থাপনার দুর্বলতার কথা বলে জঞ্জাল বাড়াতে যাচ্ছি, খেয়েদেয়ে আর কী কোন কামকাজ নেই? সমালোচনার এতই যদি সখ, তাহলে কেন ভাষাশৈলী, প্রকাশের অপারগতা নিয়ে কথা বলছি না। পাঠক এসব দোষ-গুণ শুধু আমি দেখতে যাবো কেন, আপনারাও দেখেন, শুধরিয়ে দেন। উপস্থাপনার ব্যাপারে এই কথাগুলো বলার যুক্তিযুক্ত কারণ আছে। ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাসে’র লেখক ফারুক আহমদ আমার অতি পরিচিত, আপনজন ও কাছের মানুষ। গ্রন্থটির ভিতরের মানুষ। এই গ্রন্থের মাধ্যমে আমার জন্মস্থানের ভিতরটাকে বাহির করে আমাদের হৃদয়ের কাছে পৌঁছাতে তিনি অদম্য কৌতহলি আর আমি পাঠক হিসাবে সেটাকে গিলছি। গবেষণাক্ষেত্রে ফারুক আহমদের প্রচুর সুনাম। সুতরাং তার কাছ থেকে এমন কিছু গিলতে চাই না যা হজম করতে কষ্ঠ হয়।

 

আসল কথায় আসি। আমি অবশ্যই বলবো, ইচ্ছে করে ‘গোলাপগঞ্জে ইসলাম’ অধ্যায়টি বাদ দিয়ে ফারুক কৃপনতা করলেন। এই বিষয়ে তার খুব ভাল একটা গবেষণা অতীতে প্রকাশিত হয়েছে। কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে এমন একটা অধ্যায়কে সংযোজন না করায় একদিকে পাঠক হলেন বঞ্চিত, অন্যদিকে গোলাপগঞ্জের ইতিহাস রইলো অসমাপ্ত। চাইলে কাঁচিটা অন্য যায়গায় লাগিয়ে (এ সুযোগ ছিল) এমন একটা প্রয়োজনীয় অধ্যায়কে সংযোজন করা যেত। গ্রন্থটির ভূমিকাতে বলা আছে ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস নির্মাণের সলতে পাকানোর পর্ব’ এই গ্রন্থটি। আমারও এই একই কথা তাতে কোন সন্দেহ নেই। অধির আগ্রহে আছি পরবর্তিকালে আরো ভাল, আরো স্বচ্ছ ও উন্নত কিছু দেখার।

 

আমরা মুখে মুখে ‘ঐতিহ্যবাহী গোলাপগঞ্জ’-এর বাসিন্দা বলি, বলে গর্ব করি। কিন্তু সে কোন ঐতিহ্য নিয়ে বুক ফুলিয়ে ঢেকুর দিই তা কি কখনো খতিয়ে দেখেছি! না ব্যাপারটা নিয়ে কখনো তেমন ভাবনা-চিন্তা করা হয়নি। আসলেইতো আমাদের কী এমন ঐতিহ্য আছে যা নিয়ে গর্ব করতে পারি। ব্যস্ত হবেন না, অবশ্যই আমাদের ঐতিহ্য আছে, আমাদের গর্বের ইতিহাস আছে, আমাদের সম্মানের অনেক কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এগুলো আপনার-আমার সকলেরই জানা উচিৎ। বলতে পারেন, এতসব খুঁজে দেখার সময় কোথায়? আমিও আপনার সাথে একমত। তবে ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস’ লিখে এই অসাধ্য কাজটাকে ফারুক আহমদ সহজ করে দিয়েছেন। এই বইটি গোলাপগঞ্জবাসীর জন্য গর্বের ও গৌরবের। অতুলনীয় এ গ্রন্থটির সাথে সৈয়দ মর্তুজা আলীর ‘হযরত শাহজালাল ও সিলেটের ইতিহাস’-এর তুলনা চলে। বইটার ভিতরে কত মালমশলা আছে না পড়লে অনুধাবন করা যাবে না। ফারুক আহমদের ত্রিশ বছরের পরিশ্রমের সার্থক রূপায়ন ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস’। আবারো বলছি- বইটা পড়েন ভাল লাগবে, সংগ্রহে রাখেন কাজে লাগবে, প্রচার করেন প্রসন্ন হবেন। গোলাপগঞ্জকে ভাল করে জানার এর চেয়ে ভাল ও বস্তনিষ্ঠ আর কোন কেতাব এখনো লেখা হয়নি, আর কবে হবে (আদৌ হবে কি না) তাও বলতে পারবোনা।

#

ড. আব্দুল আজিজ তকি: লেখক ও কলামিস্ট। কাউন্সিলর ওয়েস্ট মিন্সটার সিটি কাউন্সিল, লন্ডন।