উৎপল দাস : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ভিশন ২০২১ সাল সামনে রেখে চূড়ান্ত হয়েছে আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিলের ঘোষণাপত্র। মঙ্গলবার রাতে গণভবনে সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠকে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটি খসড়া ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করেন। এতে দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মতি দিয়েছেন। ১২টি দফার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এবারের কাউন্সিলের ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। ২২-২৩ অক্টোবর সম্মেলনে দেশি-বিদেশি অতিথি ও নেতা-কর্মীদের হাতে হাতে চলে যাবে ঘোষণাপত্র।

ঘোষণাপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের ২০০৮ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সরকারের উন্নয়ন কাজ ও চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর চিত্র তুলে ধরার প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করার চেয়ে চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার প্রতি জোর থাকবে ঘোষণাপত্রে।

এ ঘোষণাপত্রে প্রাধান্য পাচ্ছে বৃহৎ প্রকল্প (মেগা প্রজেক্ট) বাস্তবায়ন, শিল্প-বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার, ১০০টি অর্থনৈতিক জোন, বিদ্যুৎ,জ্বালানি ও আইসিটি খাতগুলো।

আগামী ২২-২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে।
আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় কাউন্সিলের ঘোষণাপত্রে যে ১২টি দফার ওপর গুরত্ব দেয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে-

বৃহৎ প্রকল্প (মেগা প্রজেক্ট) বাস্তবায়ন
দেশের উন্নয়নের চাকায় নতুন গতি সঞ্চারের জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রকল্পের প্রয়োজন হয়। অর্থনীতির ভাষায় যাকে ‘সজোরে ধাক্কা ’ (বিগ পুশ ) বলা হয়। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ১০টি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো- স্বপ্নের পদ্মাসেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্র বন্দর, ঢাকা দ্রুত গণপরিবহণ, এলএনজি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট, মাতারবাড়ী একহাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর, পদ্মাসেতু রেল সংযোগ এবং চট্টগ্রাম হতে কক্সবাজার পর্যন্ত ১২৯.৫ কি.মি. রেললাইন স্থাপন। আওয়ামী লীগ এ সকল মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা ও সমর্থন দিতে বদ্ধপরিকর।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও আইসিটি
২০২১ সালের মধ্যে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫১৪ কিলোওয়াটে উন্নীত করার লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২১ সালের মধ্যে ৯৬ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুতের আওতা আনা হবে। ২১ সালের মধ্যে ২০ হাজার মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৪ হাজারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বর্ধিত বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে উৎপাদন ও বণ্টনের উদ্যোগ নেয়া হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ আইসিটি আয় দুই বিলিয়ন এবং রপ্তানি আয় দুই বিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণ, আইসিটি শিল্পের জন্য একবিলিয়ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবসম্পদ তৈরি, ২০২০ সালের মধ্যে টেলিঘনত্ব ১০০ শতাংশ, ইন্টারনেট বিস্তার ১০০ শতাংশ এবং ব্রডব্যান্ড ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা থাকবে।

১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল
১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫৬টি (সরকারি খাতে ৪২টি এবং বেসরকারি খাতে ১৪টি) অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে সাতটির বাস্তায়ন কাজ চলছে। আগামী ১৫ বছরের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত ৪০০ কোটি ডলার আয় বৃদ্ধি ও এককোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ২০২১ সালের মধ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি (৮.০ শতাংশ) অর্জনের জন্য বেসরকারি ও সরকারি খাতে শিল্পায়নের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হবে।

পররাষ্ট্র
আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্র নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসছে না। ‘সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয় ’ এটাই থাকছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের সফলতার চিত্র। এর মধ্যে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মীমাংসাকে পররাষ্ট্রনীতির বিরাট মাইলফলক ধরছে দলটি। ১১১টি ছিটমহলের ১৭ হাজার ১৬০.৬৩ একর জমি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে রাখা, লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে, অধিক সংখ্যক জনসমাবেশ ঘটিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে গিনিজ বুকে স্থান করে নেয়া- এগুলো আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রনীতির সফলতার চিত্র হিসেবে উল্লেখ থাকবে ঘোষণাপত্রে।

আইনের শাসন
প্রথমবারের মতো সব দলের আলোচনা ও সার্চ কমিটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। নির্বাচন কমিশনরে আর্থিক স্বাধীনতা ও জনবল নিয়োগের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকারের জিরো টলারেন্সের কারণে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূল হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, কোকোর সিঙ্গাপুরে প্রচার করা অর্থ ফেরত আনার বিষয়গুলো ঘোষণাপত্রের ‘আইনের শাসন’ অংশে থাকবে।

শিক্ষা
আওয়ামী লীগ সরকার ছয়টি নতুন বিশ্ববিদ্যাল প্রতিষ্ঠা করেছে। আগামীতে আরো সাতটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। একহাজার কোটি টাকা স্থায়ী তহবিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন হয়েছে। দেশের শিক্ষার হার ৭১ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে বলে উল্লেখ থাকবে। প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে একটি বিদ্যালয়কে মডেল বিদ্যালয়ে পরিণত করার কাজ দ্রুততার সাথে চলছে।

শিল্প-বাণিজ্য
শিল্পায়ন ও বহুমাত্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের ফলশ্রুতিতে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বেশি মাত্রায় অঙ্গীভূত হওয়ার লক্ষ্যে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃস্টি করা, বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য উল্লেখযোগ্য কর্ম সম্পাদনে সক্ষম ম্যানুফ্যাকচারিং খাতকে একটি পরিপূর্ণ শিল্প ব্যবস্থায় পৌঁছানো, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণকে সর্বাধিক সুযোগ দেয়া, কৃষি প্রক্রিয়াজাত যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানিতে শূন্য কর সুবিধা প্রদান, পর্যাপ্ত জ্বালানি, বন্দর ও পরিবহণ অবকাঠামোর সংস্থান করা, নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে রপ্তানি বিরুদ্ধ বাধা দূরীকরণ, শ্রমশক্তিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, সরকারি আইন ও বিধিমালা ব্যবসাবান্ধব হিসেবে তৈরি করা হবে।

যোগাযোগ
দ্বিতীয় কাচঁপুর, দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু নির্মাণের কাজ শিগগিরই শুরু হবে। ২০১৮ সালের মধ্যে পদ্মাসেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। এছাড়া নির্মাণাধীন শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনহিংস সড়ক চারলেন করার কথা উল্লেখ থাকবে।

স্থানীয় সরকার
কেন্দ্রীয় সরকারের কোন কোন কাজ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের কাছে অর্পণ করা যায় তা সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা এবং সকল কাজ পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের কাছে অর্পণ করা, জেলা পরিষদ উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে দায়িত্ব বিভাজন সুনির্দিষ্ট করা হবে। বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে গড়ে উঠেছে। এই ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের উপযোগী বিশেষায়িত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সৃষ্টি এবং তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে রাজস্ব বিভাজনের একটি ন্যায্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে।

বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি
সব প্রাথমিক স্কুলে একটি এবং মাধ্যমিক স্কুলে তিনটি করে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম করা, প্রাথমিক স্কুলে ৩০ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্কুলে শতভাগ আইসিটি ল্যাবরেটরি গড়ে তোলা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা হবে- এমন ঘোষণা থাকবে আওয়ামী লীগের এবারের ঘোষণাপত্রে।

যুবশক্তি সম্পৃক্ত উন্নয়ন
বাংলাদেশের অর্ধেক জনসংখ্যা এখনো ২৫ বছরের নিচে। বিশাল এ যুব শক্তিকে উৎপাদনশীল ও আয় বর্ধনমূলক কাজে নিয়োজিত করে দেশের বেকারত্বের হার কমানোর পরিকল্পনা থাকবে। কৃষি, শিল্প ও অকৃষিখাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, একই সঙ্গে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমশক্তি বিদেশ পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

নারীর ক্ষমতায়ন-লিঙ্গ সমতা
২০২০ সালে উচ্চ পর্যায়ে শিক্ষায় নারী-পুরুষের অনুপাত ১০০ শতাংশে উন্নীতকরণ, সকল স্তরে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।

ঘোষণাপত্র উপ-কমিটির আহ্বায়ক শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, এ কমিটির সদস্যরা প্রত্যেকে একটি বিষয়ের ওপর কাজ করেছেন। তারপর আমরা বেশ কয়েকটি বৈঠক করে আমাদের পক্ষ থেকে একটা চূড়ান্ত ঘোষণাপত্র তৈরি করেছি। নেত্রী শেখ হাসিনা দেখে চূড়ান্ত করার পরই ছাপার কাজ শুরু করে দিতে যাচ্ছি।