সাইয়েদ মোহাম্মদ আবিদুহু ।।

২০১৭ সালের সবে শুরু। এর মাঝেই জাতীয় সংসদের পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিকদলগুলো চিন্তা ভাবনা শুরু করেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক নিয়োগকৃত স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনেই নির্বাচন হবে এমন কথা নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী প্রতিনিয়ত বলে চলেছেন। অন্যদিকে বিএনপি’র তরফ থেকে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি নিরপেক্ষ সরকারের দাবি করা হচ্ছে।

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি’র সমর্থকেরা ভেবেছিল, বিএনপিকে ছাড়া এই একতরফা ও একপেশে নির্বাচনের পর আন্দোলন সংগ্রাম করে খুব সহজেই আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামানো সম্ভব হবে। জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন সংগ্রামও হলো। আওয়ামী লীগের দাবি জামায়াত-বিএনপি জোট এই অরাজকতা করেছে। আর বিএনপির দাবি- আওয়ামী লীগই নাশকতা করে বিএনপির ওপর দোষ চাপিয়েছে। যেই করুক না কেন, ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে অনেক নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে। সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়েছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির অনুসারীদের আরো কয়েকটি ভ্রান্ত ধারণা ছিল। নিশা দেশাই ও তারানকো আওয়ামী লীগকে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন একটি নির্বাচন দিতে বাধ্য করবে যে নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে জনপ্রিয়তার তলানীতে ঠেকে যাওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের ভরাডুবি ঘটবে। আমেরিকান শক্তি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপিকে ক্ষমতার চেয়ারে সুন্দরভাবে বসিয়ে দেবে।

আওয়ামী লীগের অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সংকট ভেবে কিছুদিন আগে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছেন- ‘সংলাপ-সমঝোতার মাধ্যমে বর্তমান সংকটের সমাধান চাই। এসবে সমাধান না হলে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে সমাধান করা হবে।’ কঠোর আন্দোলনের শক্তি কি আসলেই আছে বিএনপি’র? ধরে নিলাম, বিএনপির আন্দোলন করার পর্যাপ্ত শক্তি আছে। কিন্তু কাদের নিয়ে আন্দোলন করবে? কার জন্য করবে? সাধারণ কর্মীরা আন্দোলনের সময় মাঠে থাকবে, কিন্তু নেতারা বাসায় বসে টিভিতে হরতালের ফুটেজ দেখবেন সেই দিন কি এখন আছে? গত আন্দোলন- সংগ্রামের সময় যারা নির্যাতিত হয়েছেন, যারা জেলে গেছেন, যারা গুম হয়েছেন- তাদের পাশে, তাদের পরিবারের পাশে বিএনপি কীভাবে দাড়িয়েছে? তাদের আইনি সহায়তা কি দল থেকে দেওয়া হয়েছে? এসব তিক্ত সত্য এখন সাধারণ বিএনপিপ্রেমীদের মুখে মুখে।

তর্কের খাতির ধরেই নিলাম- একাদশ সাধারণ নির্বাচন খুবই নিরপেক্ষ ও গ্রহনযোগ্যভাবে হবে। সেক্ষেত্রে ৩০০টি আসনে বিএনপি’র নমিনেশন দেওয়ার মতো নেতা ঠিক করা আছে কি? ১৩ বছর ধরে (২০১৯ সালে নির্বাচন হলে) ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে বিবেচেনায় বিএনপির অনেকেই দিবাস্বপ্ন দেখা শুরু করবেন এই ভেবে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের জনপ্রিয়তা যেহেতু তলানিতে, কাজেই দল থেকে নমিনেশন পেলেই নিশ্চিত জয়। সে ক্ষেত্রে বিএনপি চেয়ারপার্সনের সিলেকশনের বাইরে বিদ্রোহী অনেক প্রার্থী দাঁড়িয়ে যাবে। ২০০৬-এর ২৮ অক্টোবর থেকে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির নেতাদের আর্থিক অবস্থাও খুব একটা ভালো থাকার কথা না। বিপরীতে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ক্ষমতায়। ২০১৯ সালে নির্বাচন হলে প্রায় ১০ বছরে ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ নেতাদের অঢেল ধন-সম্পত্তি বেড়েছে। শেয়ারবাজার, ব্যাংক থেকে ভুয়া লোন দিয়ে ও বিনিময়ে ঘুষ নিয়ে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাট হয়েছে। কমিশন বাণিজ্য তো আছেই। আওয়ামী লীগ তখন নির্বাচনে জয়লাভের জন্য সেই বিদ্রোহী নেতাদের পেছনে অর্জিত টাকা থেকে টাকা ঢালবে। বিএনপির ভোট তখন বিভাজিত হয়ে যাবে এবং আওয়ামী লীগ অবধারিতভাবে জয়ী হবে।

২০১৯ সালের নির্বাচন হতে এখনো ২ বছর বাকি। এই সময়টুকু বিএনপির কাজে লাগানো উচিত। জামায়াতকে ছেড়ে এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিতে হবে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে শুরু বিভাগীয় নেতাদের সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপার্সনের সরাসরি কথা বলা শুরু করতে হবে। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় কারা কারা কর্মঠ ও ওয়েল অর্গানাইজড তাদের খুঁজে বের করে সারা দেশে এখন থেকেই নির্বাচনী সফর শুরু করতে হবে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যেমন দেশের মেধাবী লোকজনকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলেন, তেমনভাবে এখন থেকেই সৎ ও মেধাবীদের রাজনীতিতে আনতে হবে। পাশাপাশি যারা বিদ্রোহী হয়ে দলকে বিপদে ফেলতে পারেন তাদের খুঁজে বের করে বিকল্পভাবে তাদের প্রোভাইড করার আশ্বাস দিতে হবে। বিএনপির চেয়ারপার্সনের একটি ব্যক্তিগত ইমেইল একাউন্ট খুলে জনগণকে বলতে হবে- “আপনারা আপনাদের সমস্যা জানান, সহায়ক দিকনির্দেশনা প্রদান করুন, কোনো সাজেশন থাকলে সেটাও জানান।” পাশাপাশি যুগোপযোগী একটি নির্বাচনী মেনিফেস্টোও তৈরি করে জনগণকে ক্লিয়ার মেসেজ দিতে হবে বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশ ও জনগণের জন্য কী কী করবে। বিএনপি ক্ষমতায় যেতে পারুক বা না পারুক, দেশের স্বার্থকে মাথায় রেখে ব্যালান্সড গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতেই হবে।

লেখক : প্রকৌশলী ও সাংবাদিক