প্রশাসনের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে মুক্তিযোদ্ধার আত্মহত্যা!
প্রকাশিত হয়েছে : ৫:০৮:১৮,অপরাহ্ন ২০ মার্চ ২০১৯ | সংবাদটি ৫৮১ বার পঠিত
ইমরান আহমদ, সিলেট :: জলফে আলী, বয়স ৭৮-৭৯ কোটায়। ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার টানে নিজের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেন। ভুলে যান স্ত্রী, সন্তানসহ আত্মীয় স্বজনের কথা। দেশ স্বাধীন হলে সবার সাথে আবার দেখা হবে এ আশায় দিনের পর দিন যুদ্ধ করেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলো, লাল-সবুজের পতাকা উড়লো, এমপি, মন্ত্রীর গাড়িতেও পতাকা ঘুরে। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘুরেনি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের গুদিগাঁও গ্রামের আমির আলীর পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা জলফে আলীর। সরকারিভাবে বন্দোবস্ত পাওয়া ভুমি উদ্ধারে ঘুরেছেন প্রশাসনের ধারে ধারে। একদিকে অভাব অনটনের সংসার, অন্যদিকে ভূমি উদ্ধানে প্রশাসনের কোন সহযোগিতা না পাওয়ার অভিমানে বিষপানে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিলেন বীর এ সৈনিক। গত ১৭ মার্চ সুনামগঞ্জ সদরে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের শৌচাগারে গিয়ে বিষপান করে চিরতরে বিদায় নেন এ পৃথিবী থেকে।
সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত সংবাদে জানাযায়, গত ১৭ মার্চ সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবসের অনুষ্ঠানে ৭১’র সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা, সরকারি-বেসরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সাথে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা জলফে আলী।
দুপুরের দিকে তিনি ফিরে যান জেলা শহরে থাকা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে। কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায় শৌচাগারে গিয়ে ঘন্টা/তিনেক পেরিয়ে গেলে তিনি নীচ তলায় ফিরে না আসায় তার সন্ধানে তৃতীয় তলায় যান নৈশ প্রহরী। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে নৈশ প্রহরি আতিকুর রহমান সোহাগ শৌচাগারে সামনে গেলে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ পান। এরপর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পাওয়া ভেতরে কোন ব্যাক্তির অবস্থান অনুমান করতে পারলেও ভেতর থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে আশপাশের লোকজনকে ও ব্যবসায়ীদের ডেকে তিনি জড়ো করেন।
এক পর্যায়ে শৌচাগারের দরজা ফুটো করে দেখেন একজন মানুষের নিথর দেহ পড়ে আছে। পরবর্তীতে সদর মডেল থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে শৌচাগারের ভেতর পড়ে থাকা বীরমুক্তি জলফে আলীর লাশ উদ্ধার করে।লাশের পাশেই পড়েছিল কীটনাশকে (বিষ)’র বোতল ।’
সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই প্রদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বিষপান করেই বীরমুক্তিযোদ্ধা আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরীর পর রবিবার রাতে লাশ মর্গে পাঠানোর পর ময়নাতদন্ত শেষে ওই রাতেই প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়।’ এব্যাপারে বীরমুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মরিয়ম বিবি রবিবার রাতে সদর মডেল থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা ডায়রী ভুক্ত করেন।
প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার পারিবারীক সুত্রে জানা যায়, রবিবার সকালে সিলেটে যাবার কথা বলে জলফে আলী সদর উপজেলার গুদিগাঁও’র বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু বিকেলে ফিরেন লাশ হয়ে। পরদিন সোমবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
জানাযায়, জলফে আলী একজন রাষ্ট্রীয় ভাতা প্রাপ্ত বীরমুক্তিযোদ্ধা। প্রথম স্ত্রী মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর চার ছেলে মেয়ে ঢাকায় অবস্থা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে।’ এদিকে গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের গুদিগাঁও’ দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী কে নিয়ে বসবাস করতেন জলফে আলী। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন অন্যত্র। মেয়ের জামাইরাও দিনমজুরী করেন।’
ভুমিহীন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে জলফে আলী সদর উপজেলার নারায়ণতলা মৌজায় প্রায় দুই যুগ পুর্বে ৮০ একর ভুমি সরকারি ভাবে বন্দোবস্ত হন। এরপর ওই ভুমিতে নিজের দখলে টিনশেডের একটি ছোট বসতঘর ছাড়া অধিকাংশ ভুমি অন্যরা দখল করে ভোগ করতে থাকে। ওই ভুমি নিজের দখলে পেতে গত প্রায় ৫ থেকে ৬ বছর ধরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলা প্রশাসক সহ প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে আবেদন- অভিযোগ করেও দিনের পর দিন ধর্ণা দিয়েও বন্দোবস্তপ্রাপ্ত ভুমি উদ্যারে প্রশাসনের তরফ থেকে কোন রকম সহযোগিতাই পাননি ওই বয়োবৃদ্ধ বীর মুক্তিযোদ্ধা।
এ কারনে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভের পাশাপাশী ক্রমশ হতাশায় ভুগছিলেন। এমন হতাশা থেকে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লে বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধার নানা রোগ ব্যাধি ও সংসারে অভাব অনটনও জেকে বসে। প্রথম পক্ষের প্রয়াত স্ত্রীর চার ছেলে মেয়ে ঢাকায় থাকলেও দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেয়া দুই মেয়েকে গ্রামেই বিয়ে দেয়া হয়, দুই মেয়ের পরিবারও ছিল অস্বচ্ছল। মেয়ের জামাইরা দিনমজুরি করে কোন রকম জীবিকা নির্বাহ করতেন।
মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মরিয়ম বিবি জানান, ভুমিটি পুরোপুরি উদ্ধার হলে জীবনের শেষ সময়ে ঢাকায় ও গ্রামে থাকা ছেলে মেয়েদের বসবাসের জায়গা করে দিয়ে যাবার জন্য তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু ভুমি উদ্ধারে তিনি প্রশাসনের কোন সহযোগীতা না পেয়ে ভুগতে ভুগতে গতকয়েক মাস ধরেই বাড়িতে বলাবলি করতেন জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলাম,জাতীর জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার পরিজনকে নানা সুযোগ সুবিধা দেয়ার পাশাপাশী , সম্মান ভালবাসাও দিয়েছেন কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনে কোন প্রয়োজনে গেলে আমাদের তেমন ভাবে কোন মুল্যায়ন করা হয়না।
তিনি আরো বলেন, মৃত্যুর দিন কয়েক পুর্বেও তিনি ভুমি উদ্ধারে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট আরো একদফা মৌখিক ভাবে এমনকি লিখিত আবেদন করেছিলেন কিন্তু তাতেও সাড়া পাওয়া যায়নি, তাই হয়ত প্রশাসনের সহায়তা না পাওয়ার ক্ষোভে ও অভাবের তাড়না সইতে না পেরেই তিনি আত্বহত্যার পথ বেচে নিয়েছিলেন।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইয়াসমিন নাহার রুমার নিকট এ বিষয়ে বিস্তারিত অবহিত করে উনার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, বহু বছর পুর্বে মুক্তিযোদ্ধা জলফে আলী ৮০ শতাংশ ভুমি সরকারিভাবে বন্দোবস্ত পেয়েছেন বলে বিষয়টি আমি জানি, মৃত্যুর দিন কয়েক পুর্বে উনি আমার সাথে অফিসে এসে দেখা করে আমাকে মৌখিকভাবে ওই ভুমি অন্যদের দখলের থাকা ও ভুমিটি উদ্ধারের জন্য সরকারি সহায়তা চেয়েছেন কিন্তু লিখিত ভাবে কোন আবেদন তিনি করেননি।