করোনাকালে দুর্বোধ্য নয় বোধগম্য ভাষা ব্যবহার করুন
প্রকাশিত হয়েছে : ২:৪৬:০৫,অপরাহ্ন ১৫ এপ্রিল ২০২০ | সংবাদটি ১০০০ বার পঠিত
জাহেদ জারিফঃ

করোনায় ইতোমধ্যে কতো পরিচিত প্রিয়মুখ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন তার হিসেব কষতে গেলে বাতাস ভারী হয়ে উঠে।অস্বস্তিবোধ হয়,স্বজনদের শোকের মাতম চোখে ভাসে।নিজেও যে খুব নিরাপদ আছি তাও নয়।রাত-বিরাত নিউইয়র্কের পথে এম্বুলেন্সের গগনবিদারী আওয়াজ বুকের মধ্যে কাঁপুন তুলে।ভাবি হয়তোবা কেউ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আশ্রয় নিচ্ছেন নতুবা কেউ লাশ হয়ে ফিরছেন।মনের অজান্তেই এমন নেতিবাচক ভাবনা ভর করে বসে।যে হারে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে তাতে এমন ভাবনা হওয়া অযৌক্তিক নয়।তবুও জোর করে মন থেকে নেতিবাচকতা সরাই।দু:স্বপ্ন ঝেড়ে মুছে ফেলি,মানুষের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বপ্ন বুনি।অবচেতনে আমি এক দ্বান্দ্বিকতার মুখামুখি হই।সমস্ত পরিসংখ্যান,মৃতের সম্ভাব্য সংখ্যা সবকিছুতেই সন্দেহ ও অবিশ্বাসের ভান করি।বলি হয়তো কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল গিয়েছিলেন; চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েই বাড়ি ফিরছেন।আমার স্বপ্ন আর বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।এখানে আমাদের প্রতিটি সকাল হয় প্রাণঘাতী করোনায় নতুন আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা পড়ে।টিভি স্ক্রিনে স্বজন হারানো মানুষের বুকফাটা কান্না আর চোখের জল দেখে।একদিনে আক্রান্ত বা মৃতের দিক দিয়ে রেকর্ডের গাণিতিক হিসেব দেখে।এই লেখা প্রস্তুত করা অবদি (০৪/১৫/২০২০,১:৪২রাত) আমেরিকায় নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ৬০৯২৪০ আর মোট মৃতের সংখ্যা ২৬০৩৩। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাটি অপ্রতিরোধ্য গতিতে বেড়েই চলছে। আমেরিকায় করোনা আক্রান্তের দিক দিয়ে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে নিউইয়র্ক। নিউইয়র্কেই আমার বসবাস।সঙ্গতকারণেই আক্রান্ত বা মৃত মানুষের অনেকেই আমার চেনাজানা,বন্ধুমহল,কলিগ কিংবা কমিউনিটির পরিচিত মুখ। কাছের মানুষের অসহায়ত্ব,অনাকাঙ্খিত ও অকাল মৃত্যুতে এমনিতেই আমরা আধমরা হয়ে বেঁচে আছি।এই আধমরা বেঁচে থাকাটাও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে যখন দেখি প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে করোনা নিয়ে আমাদের রাজনীতিবিদ ও ধর্মজীবিরা ছেলেখেলায় মেতে উঠেন।করোনাকে তারা কতোখানি মামুলি বিষয় মনে করেন তা তাদের কথাবার্তা ও আচরনেই স্পষ্ট হয়ে উঠে। তাদের কথাবার্তায় মনে হয় তারা বর্তমান বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন কোন গ্রহে থাকেন।বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও ধর্মজ্ঞদের আচরনে এদেরকে এলিয়েন মনে হয়।তবে করোনায় তাদের চৈতন্য ফিরতে বেশি সময় লাগেনি। দু:খের বিষয় ততোদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে।আমাদের রাজনীতিবিদ ও ধর্মজীবিরা প্রথমে করোনাকে রাজনৈতিক দুরাচার ও ধর্মীয় তেলেসমাতি প্রদর্শনের রশদ হিসেবে নিয়েছিলো। কেউ কেউ বলেছেন,কসম মুসলমানদের কখনো করোনা হবে না!এসব নাস্তিকদের জন্য আল্লাহর গজব।সুতরাং মসজিদ বন্ধের ঘোষণা আসলে পরিনাম ভালো হবে না ইত্যাদি।
জাতিরজনকের কন্যা, এ দেশের মানুষের শেষ ভরসাস্থল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা মোকাবিলায় যে যুগান্তকারী প্রদক্ষেপ নিয়েছেন তাতে আমরা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি।কিন্তু দু:খের বিষয় করোনা ঠেকাতে আমাদের রাজনীতিবিদ ও আমলাদের কিয়দাংশের আচরন আমাদেরকে ক্ষুব্ধ করেছে,হতাশা বাড়িয়েছে এবং নিরাশ করেছে।রাজনীতিবিদেরা গরীবের ত্রাণ আত্মসাতের খেলায় মেতে উঠেছেন উপরন্তু বেশীরভাগ রাজনীতিবিদেরা জাতির ক্রান্তিলগ্নে গা ঢাকা দিয়েছেন।নির্বাচন আসলে মাঠেঘাটে নেতাকর্মীদের যতোটা উপছে পড়া ভীড় থাকে,করোনা মহামারীতে জনগনের সেবায় তারা ততটাই নিষ্প্রভ,নিরুদ্দ্যেশ।আর আমাদের নীতি নির্ধারক ও আমলাদের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও তাদের কৌশল-কর্মপন্থা কিছুটা বিব্রতকর।কিছু কিছু সরকারী আমলা রাস্তাঘাট ও হাটবাজারে প্রবীণদের কানধরে উঠবস করিয়েছেন যা অনৈতিক,অবিবেচক ও অতি উৎসাহী গর্হিত কাজ মনে হয়েছে।আবার অনেকেই জনগনকে সাহায্য করার ছবি সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার করে নিজেকে জাহির করার ভ্রান্ত খায়েশ পূরণ করেছেন।তারা বেমালুম ভুলে গেলেন তারা তাদের কেবল দায়িত্বই পালন করছেন।তারা জনগনকে ঘরমুখী করতে, সচেতনতা বাড়াতে বাস্তবে ঠিকই কাজ করছেন তবে তা খুব একটা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সংবাদ সম্মেলন,মাইকিং,পত্রপত্রিকায় লেখালেখি এমনকি সরেজমিন বাড়ী বাড়ী গিয়ে ঠিকই কাজ করছেন কিন্তু তারা বিদেশ থেকে আমদানি করা যেসব দুর্বোধ্য,অপরিচিত শব্দ ব্যবহার করছেন তাতে সাধারণ মানুষ সচেতন হওয়া দূরে থাক বিভ্রান্ত হচ্ছেন ঢের বেশী।
লকডাউন,আইসোলেশন,কোয়ারেন্টাইন,সোশ্যাল ডিসটেন্স শব্দগুচ্ছ এদেশের সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত,বোধগম্যহীন। প্রফেসর শামসুজ্জামান খান স্যার তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন ,তাঁর এক বন্ধুকে কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি উত্তর দিলেন মানুষেরা আমাদের বাড়ীঘর দেখতে ভীড় জমাচ্ছে, লকডাউনে ঘরবাড়ী কেমন দেখায় তা পরখ করতে!
আমাদের নীতি নির্ধারক,সাংবাদিক,আমলা ও রাজনীতিবিদেরা এই মহা দুর্যোগের সময় অজানা,অচেনা,দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার না করে নিজেদের ভাষায় এমন কোন উপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করা উচিত যা সাধারন মানুষের কাছে বোধগম্য ও বহুল ব্যবহৃত।হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মনে করছেন ২০২২ সাল পর্যন্ত এই সামাজিক দূরত্ব তথা যেকোন কাজে একে অন্য থেকে ছয় ফুট বা দুই মিটার দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হতে পারে।এই মহাদুর্যোগের সময়েও যদি ভাষা কেন্দ্রিক জটিলতায় আমাদের আমজনতা,খেটেখাওয়া নিরক্ষর মানুষকে বিভ্রান্ত হতে হয় তাহলে প্রাণের বিনিময়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা কিংবা জাতিসংঘের স্বীকৃতি আদায়ের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই যে ভেস্তে যাবে,তা কি কেউ একবারও ভেবে দেখেছেন?
জাহেদ জারিফ: লেখক,সাংবাদিক ও সংগঠক।নিউইয়র্ক।






