ফয়সাল শামীম, কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে হাতুরে চিকিৎসক ও চরাঞ্চলে কবিরাজের দৌরাত্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং হাজার হাজার সরল সহজ নিরহ গ্রামবাসী চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসায় প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। গত ১ মাস ধরে জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে।

নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরব্দ, নুনখাওয়া, কালীগঞ্জ, বেরুবাড়ী, কেদার, কচাকাটা, মাদারগঞ্জ, হাসনাবাদ, স্কুলের হাট, ভুরুঙ্গামারীর সোনাহাট, শিলখুড়ি, আন্দারীরঝাড়, জয়মনিরহাট, ফুলবাড়ীর বালারহাট, শিমুরবাড়ী, গংগারহাট, সদরের পাটেশ্বরী, ঘোগাদহ, যাত্রাপুর, উলিপুরের দলদলিয়া, গুনাইগাছ, তবকপুর, রাজারহাটের সিনাই, দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন হাটবাজারে ঘুরে দেখা গেছে হাতুরে চিকিৎসকরা তাদের দোকানের সামনে বা চেম্বারে সাধারন মানুকে আকৃষ্ট করতে বিশাল সাইনবোডে নিজের নামের পাশে নানা উপাধি ও ডিগ্রী জুড়ে দিয়েছেন। আসলে এদের নাই স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠানিক লেখাপড়া এবং একাডেমীক সার্টিফিকেট। এদের অধিকাংশই পড়ালেখা পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত। ভিতরবন্দ বাজারের আব্দুল ছামাদ নামের একজন চিকিৎসক তার পড়ালেখা অষ্টম শ্রেনী।

তার সাইনবোডে লেখা হয়েছে-আরএমপি, পিসিডি, এমপি, খোজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন ঔষুধ কোম্পানীর এজেন্টরা ‘চিকিৎসা নির্দ্দেশিকা’ ও সহায়িকা’ নামের কিছু চটি বই প্রস্তক দেন সেটা পড়েই রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এই সব চিকিৎসক রোগী এলে সঠিক রোগ নির্নয় না করেই প্রথমেই হায়ার এন্টিবাইটিক দিয়ে থাকেন। এ রকম শত শত হাতুরে চিকিৎসক ভুয়া ডিগ্রী লিখে অপচিকিৎসা দিয়ে গরীর মানুষকে ঠকাচ্ছেন। অপরদিকে চরাঞ্চলে একশ্রেনী কবিরাজ নিজের তৈরী করা বটিকা ও শালসা দিয়ে গ্যাষ্টিক, পেটের পিড়া, মেহ প্রমেহ, বাত, ডায়াবেটিক, সর্দিকাশী, যৌনরোগসহ যতপ্রকার জটিল কঠিন রোগ আছে তার ১০০% গ্রান্টিসহকারে চিকিৎসা করে থাকেন। গ্রামের ও চরাঞ্চলে সরল মানুষগুলো সহজে তা বিশ্বাস করে তাদের কাছে চিকিৎসা নেন।

ভিতরবন্দ এলাকার দেবেত্তর গ্রামে আমির আলী বলেন, ‘গত দুই মাস আগে মোর মায়ের বাসলী রোগ (প্যারালাইসিস) হইছে ওহেদ আলী কবিরাজ গ্যারান্টি দিয়া চিকিৎসা শুরু করে। ১ মাস মাকে বাড়ীর ভিতর আঙ্গিনায় রোগীকে শুয়ে দোতরা বাজিয়ে ৬টি মেয়ে নাচিয়ে মন্ত্র পরে ঝাকফুক দেয় ও মালিস করে। ৮ হাজার টাকা খরচ হইছে। কোন উপকার হয় নাই। পরে রংপুর মেডিকেলে বড় ডাক্তার দেখাইছি। ডাক্তার সব শুনে রাগ করে বলছেন খুব দেরী হয়ে গেছে রোগী আর ভাল নাই। নাগেশ্বরীর চর কাপনা গ্রামের মকবুল হোসেন বলেন, পেটের ব্যাথার জন্য নুনখাওয়া হাটে কবিরাজের কাছ থেকে ১৭৫ টাকা দিয়ে একটি শালসার বোতল নিয়ে খেয়ে পায়খানা করতে করতে প্রায় মরে যেতে বসেছি। পরে কুড়িগ্রাম হাসপাতালে ৭ দিন চিকিৎসা নিয়ে ভাল হয়েছি।

তিনি আরো জানান, চরাঞ্চলের অবস্থা আরো ভয়াবহ। ওখানকার মানুষ গ্রাম্য কবিরাজ ও হাতুরে চিকিৎসকের কাছে জিম্মী। যোগাযোগ করা হলে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডাক্তার আমিনুল ইসলাম সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি সেন্টার আছে। সেখানে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও ঔষুধ আছে। মানুষ সেখানে না গিয়ে হাতুরে চিকিৎসকের কাছে অপচিকিৎসা নিয়ে প্রতারিত হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সরেজমিন দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।