চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণে সহায়তা দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এ লক্ষ্যে ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ২৪০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮০ টাকা ধরে)।

বুধবার (২১ জুন) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ সংক্রান্ত দুটি ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে স্বাক্ষর করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ভারপ্রাপ্ত সচিব কাজী শফিকুল আযম এবং এডিবির প্রিন্সিপাল কান্ট্রি স্পেশালিস্ট জ্যোৎস্না ভার্মা।
‘সাসেক চিটাগং-কক্সবাজার রেলওয়ে প্রজেক্ট’শীর্ষক প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের (ফেজ ১) জন্য এ অর্থ ব্যয় করা হবে। ২০২২ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করবে বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে কাজী শফিকুল আযম বলেছেন, ‘যোগাযোগ খাতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। অর্থায়নের অভাবে দীর্ঘদিন প্রকল্পটি ঝুলে ছিল। এখন আর প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় নেই।’

তিনি জানিয়েছেন, এ প্রকল্পে এডিবি তাদের বহুস্তর ভিত্তিক ঋণ সুবিধার (এমএফএফ) আওতায় চার কিস্তিতে ১৫০ কোটি ডলার ঋণ দেবে। এর অংশ হিসেবে প্রথম কিস্তির ৩০ কোটি ডলার দিচ্ছে সংস্থাটি। এটিসহ চলতি অর্থবছরে এডিবির ঋণ প্রতিশ্রুতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। একক অর্থবছরে বাংলাদেশের জন্য এটি এডিবির সর্বোচ্চ পরিমাণ ঋণ প্রতিশ্রুতি।

জ্যোৎস্না ভার্মা বলেছেন, ‘প্রকল্পটি বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং রেলওয়ের মহাপরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে প্রথমবারের মতো সরাসরি রেলযোগাযোগ স্থাপিত হবে, যা ওই এলাকার পর্যটন ও ব্যবসা বাণিজ্যের বিকাশে সহযোগিতা করবে। এ ছাড়া প্রকল্পটি ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। এটি বাস্তবায়ন হলে প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গেও সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে।’

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সাউথ এশিয়া সাব রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) প্রকল্পের আওতায় এই ঋণ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ২১ কোটি ডলার অর্ডিনারি ক্যাপিটাল রিসোর্সেস (ওসিআর) ঋণ, যার সুদের হার নির্ধারতি হবে লাইবর (লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফারড রেট) ভিত্তিতে। এর সঙ্গে আরও দশমিক ৫ শতাংশ সুদ এবং দশমিক ১ শতাংশ ম্যাচুরিটি প্রিমিয়াম যুক্ত হবে। এ ছাড়াও অবিতরণকৃত ঋণের ওপর কমিটমেন্ট চার্জ দিতে হবে দশমিক ১৫ শতাংশ। ঋণের এ অংশ পরিশোধে ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সময় পাওয়া যাবে ২৫ বছর। অবশিষ্ট ৯ কোটি ডলার সহজ শর্তের সিওএল ঋণ, যা ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছরে পরিশোধ করতে হবে এবং প্রকল্পের মেয়াদে এ ঋণের জন্য ২ শতাংশ বার্ষিক সুদ দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রকল্পের পরিচালক মফিজুর রহমান বলেছেন, ‘দুটি ধাপে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার সিংগেল লাইন ডুয়েল গেজ নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে ১ হাজার ৪০০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। প্রকল্পের অন্যান্য কাজও এগিয়ে চলছে।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে রামু হয়ে রেললাইনটি কক্সবাজার দিয়ে মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম সীমান্তে পৌঁছবে। এই রেললাইনের পুরোটাই হবে ডুয়াল গেজের। প্রকল্পটি পর্যটন শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের দ্বার উন্মোচিত হবে। প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারে তৈরি হবে ঝিনুকের আদলে দৃষ্টিনন্দন একটি রেলওয়ে স্টেশন। এই স্থাপনা ঘিরে গড়ে উঠবে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হোটেল, বাণিজ্যিক ভবন, বিপণিবিতান ও বহুতলবিশিষ্ট আবাসিক ভবন। রেললাইনটি নির্মাণ হলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ৬ ঘণ্টা; যেখানে বর্তমানে গাড়িতে যেতে লাগে ১০ ঘণ্টা বা তারও বেশি। এমনকি কলকাতা থেকেও কেউ কক্সবাজার আসতে চাইলে সময় লাগবে ১৬ ঘণ্টার মতো। ২০২২ সালের মধ্যে এ রুটে ট্রেন চালুর কথা রয়েছে। এটি চালু হলে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি বছর ২৯ লাখ যাত্রী এ রুট ব্যবহার করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।