বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী কানাডা শাখার দুইদিনব্যাপী ৫ম দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও সাংস্কৃতিক উৎসব ২০১৬ ও শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্ধোধনে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি কামাল লোহানী উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তিনি আরো বলেছেন, উদীচীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের জন্য নয় এবং তা কোন প্রকার ভয়-ভীতি, লোভ-প্রলোভনের কাছে নত নয়। সারা বিশ্ব জুড়ে যে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ মাথা তুলছে, তা প্রতিহত করতে এই মুহুর্ত্তে উদীচীর আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। টরন্টো শহরে গত ১৭ ও ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০১৬ শনি ও রবিবার ২দিন ব্যাপী এই বিশাল অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। প্রথম দিন ১৭ই সেপ্টেম্বর শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক উৎসব ২০১৬-এর অনুষ্ঠানশালা সম্পন্ন হয় ২৩৭ স্যাকভিল ষ্ট্রিটের বুলগেরিয়ান চার্চের সুবিশাল হলে। দ্বিতীয় দিন ১৮ই সেপ্টেম্বর রবিবার সম্মেলনের মুল পর্ব উদ্বোধনী র‌্যালী ও কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় বাঙালী পাড়ার প্রানকেন্দ্র ড্যানফোর্থের মিজান কমপ্লেক্স অডিটরিয়ামে।

সম্মেলনের প্রথম দিনকার অনুষ্ঠানের শুরু হয় বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত উদীচীর শিল্পীদের গাওয়া জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে ২৩৭ স্যাকভিল ষ্ট্রিটের বুলগেরিয়ান চার্চের সুবিশাল অডিটরিয়ামে। সেখানে কেন্দ্রীয় সভাপতির ভিডিও সংযোগের ঘোষণা এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আজিজুল মালিক তাঁর পক্ষে ১ম দিনের অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। তারপর শুরু হয় শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার নানান পর্ব। ক গ্রুপ (৪-৮ বছর) ও খ গ্রুপের (৯-১৩ বছর) চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা শেষ হলে শুরু হয় ক ও খ গ্রুপের আবৃত্তি। তারপর শুরু হয়, দেশাত্মবোধক, রবীন্দ্রসংগীত ও গ গ্রুপের (১৪-১৮ বছর) নজরুলগীতির প্রতিযোগিতা। সবশেষে ছিল উক্ত তিন গ্রুপের সাধারণ নৃত্য ও উচ্চাংগ নৃত্য। প্রতিযোগিতা পর্ব শেষ হলে সন্ধ্যা ৬.০০টায় শুরু হয় উদীচীর মনোগ্রাম খচিত পুরস্কার বিতরণী এবং এপ্রিসিয়েশন সনদ পত্র প্রদান। পুরস্কার বিতরণে ছিলেন বিশেষ অতিথিদ্বয়, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য আজিজুল মালিক, সম্মেলন ২০১৬ প্রস্তুতি পরিষদের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী শাহজাহান কামাল এবং কানাডা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহবুব আলম।

পুরস্কার বিতরণ শেষে সংক্ষিপ্ত অথচ মূল্যবান আলোচনা সভায় অংশ নেন অতিথিবৃন্দ। বিশেষ অতিথি বিশিষ্ট লেখক গবেষক ডঃ করুণাময় গোস্বামী ও আমেরিকা প্রবাসী দার্শনিক-সাহিত্যিক ডাঃ দেবাশীষ মৃধা তাঁদের বক্তব্যে বিশ্বব্যাপী বেড়ে ওঠা নানা রকম দানবশক্তির বিরুদ্ধে উদীচীর কর্মীদের আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। এ সমস্ত দানবশক্তির উত্থান বন্ধ না করতে পারলে মানবতার অপমান হওয়া বন্ধ হবে না বলে তারা মন্তব্য করেন। উক্ত সম্মেলনে আসতে না পারলেও শুভেচ্ছা বাণী পাঠান কানাডা সরকারের ফেডারেল অর্থমন্ত্রী বিল মুনরো ও প্রাদেশিক মন্ত্রী স্থানীয় এমপিপি গ্লেন মারে।

মঞ্চে আরো বক্তব্য রাখেন সম্মেলন ২০১৬ প্রস্তুতি পরিষদ চেয়ারম্যান, প্রস্তুতি পরিষদের আহ্বায়ক সৈয়দ আজফার ফেরদৌস, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য, কানাডা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক সৌমেন সাহা। এছাড়াও সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনের পক্ষে লেখিকা সালমা বানী সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। সাধারণ সম্পাদক সভাটি পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য ভিসা-জটিলতায় উপস্থিত থাকতে পারেননি কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি জনাব কামাল লোহানী এবং সাধারণ সম্পাদক প্রবীর সরদার। কেন্দ্রীয় সভাপতি ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে মাধ্যমে শাখার সম্মেলনে অংশগ্রহন করে সবাইকে উৎসাহিত করেন।

আলোচনা পর্বের শেষে কানাডা শাখার স্বনামখ্যাত নিজস্ব শিল্পীবৃন্দ শুরু করেন তাদের নৃত্য-গীতি আলেখ্য রুখে দাও দানবের দাম্ভিক মিছিল। সংক্ষিপ্ত অথচ মনোগ্রাহী এই গণসংগীত ও আবৃত্তির পর্বটি হলভর্তি মানুষ বিমুগ্ধ চিত্তে উদীচীর ঐতিহ্যবাহী সমস্ত গণসংগীত উপভোগ করেন। এটির নৃত্যাংশ পরিচালনায় ছিলেন কৃতি নৃত্যপরিচালক সীমা বড়–য়া। এর পর শুরু হয় প্রথম দিনের সাংস্কৃতিক উৎসবের সর্বশেষ পরিবেশনা লোককাহিনী ভিত্তিক গীতি-নৃত্য-নাট্য সোনাই মাধব পালাগানের। পালাগানটির পরিকল্পনা পরিচালনায় ছিলেন কৃতি নৃত্যপরিচালক তাপস দেব। অত্যন্ত সমৃদ্ধ লোকায়ত বাঙালী সংস্কৃতিকে প্রবাসে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য কানাডা উদীচীর এটি দ্বিতীয় বছরের একটি বৃহৎ পরিবেশনা।

দ্বিতীয় দিন রবিবার ১৮ই সেপ্টেম্বর সকাল ১০.৩০ ড্যানফোর্থ রোডের বিখ্যাত ঘরোয়া রেষ্টুরেন্ট চত্বরে শুরু হয় বেলুন ও ফেষ্টুন উড়িয়ে সম্মেলনের বর্ণাঢ্য উদ্বোধন ও সুসজ্জিত র‌্যালী। উদীচীর সুসজ্জিত র‌্যালী ঘরোয়া রেষ্টুরেন্ট চত্বরে শুরু হয়ে পুর্বদিকে ভিক্টোরিয়া পার্ক এভিনিউ পর্যন্ত এবং পশ্চিমে ডজ রোড পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করে। উদীচীর সকল স্তরের সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীরা এই উদ্বোধন পর্ব অংশ নেন। বিশেষ অতিথি হিসাবে এই উদ্বোধন ঘোষণা করেন ডঃ করুণাময় গোস্বামী এবং সাথে ছিলেন কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য আজিজুল মালিক। র‌্যালী শেষে উদীচীর সদস্য্যবৃন্দ মিজান কমপ্লেক্স অডিটরিয়ামে কাউন্সিল অধিবেশনে যোগদান করেন। বেলা ১২.০০টায় শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৭.০০টা পর্যন্ত এই অধিবেশন চলে। অধিবেশন শেষে সৈয়দ আজফার ফেরদৌসকে সভাপতি এবং সৌমেন সাহাকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩৮ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।

উদীচীর নবনির্বাচিত কমিটি ২০১৬-২০১৮ এর সদস্যবৃন্দ। সর্বজনাব সভাপতি সৈয়দ আজফার ফেরদৌস, সহসভাপতি সুভাষ দাশ, চিত্ত ভৌমিক, নাহিদ কবির কাকলী, মিনারা বেগম, হাসমত আরা চৌধুরী জুঁই, স্বপন বিশ্বাস, বাবলা দেব (মন্ট্রিয়ল), সাধারণ সম্পাদক সৌমেন সাহা, সহ-সাধারণ সম্পাদক অনুপ সেনগুপ্ত, সোলায়মান তালুত, শাহাবুদ্দিন ভুঁইয়া স্বপন, কোষাধ্যক্ষ দুলাল পাল, সম্পাদকমন্ডলী মুক্তি প্রসাদ, অখিল সাহা, জয় দাশ, সজীব চৌধুরী, ওমর হায়াৎ, প্রতিমা সরকার, তাপস দেব, অনিরুদ্ধ ভদ্র অমি। কার্যকরী পরিষদ সদস্য হিসেবে আছেন আজিজুল মালিক, মাহবুব আলম, হাবীবুর রহমান, শেখর গোমেজ, অপুর্ব দাস (অটোয়া), স্বপ্না দাস, সীমা দাস, সীমা বড়–য়া, সুরভী সাইদ, পরিতোষ পাল, পার্থ সরকার, রেজা অনিরুদ্ধ, রিনি শাখাওয়াত, সুনীতি সরদার, হোসনে আরা জেমী, সাবরিনা নূরী, রোকেয়া পারভীন।

এইবারের কমিটির সাথে উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য হিসেবে আছেন সর্বজনাব মাহফুজুল বারী, নাসির উদ দুজা, বিদ্যুৎ রঞ্জন দে, শাহজাহান কামাল, রনি প্রেন্টিস রয়, খন্দকার টিটো, শিপ্রা চৌধুরী, আলেয়া শরাফী, সাইয়েদ আফসার, রানা দেব রায়, মুস্তাফা মাহমুদ, পার্থসারথী শিকদার, ডঃ মঞ্জুরে খোদা (টরিক), ইলোরা আমিন, ডঃ মমতাজ মমতা, ডঃ মঞ্জুরে খোদা, মাসুক মোহাম্মাদ, রোমান চৌধুরী, কাজী জহির উদ্দিন এবং ফায়েজুল করিম।