যুক্তরাজ্যে আগাম নির্বাচনে অনুষ্ঠিত ভোটে প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে পার্লামেন্টে বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন বলেই মনে করা হচ্ছে। আর এমন হলে ব্রেক্সিট (ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়া)আলোচনা প্রক্রিয়ায় মে’র অবস্থান আরও সুসংহত হওয়ার আশা আছে।

সর্বশেষ একটি জরিপে গত ২৪ ঘন্টার অন্যান্য জনমত জরিপের মতই ফল এসেছে। এতে দেখা গেছে, কনজারভেটিভ দলের জনসমর্থন আগে সময়ে সময়ে কমলেও শেষদিকে এসে তা বেড়েছে।

তবে ম্যানচেস্টার এবং লন্ডনে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে ৫ জনে একজন ভোটারই এখনও সিদ্ধান্তহীন রয়ে গেছে। অনেক ভোটকেন্দ্রেই ভোট চলছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে।

তারপরও বৃহস্পতিবার লন্ডন ইভেনিং স্ট্যান্ডার্ড স্থানীয় পত্রিকার জন্য পরিচালিত ইপসোস এমওআরআই জরিপে দেখা গেছে, কনজারভেটিভরা ৪৪ শতাংশ এবং লেবার পার্টি ৩৬ শতাংশ জনসমর্থন পেয়েছে। এক সপ্তাহ আগের তুলনায় কনজারভেটিভদের এ সমর্থন অনেক বেশি। তবে তা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের তুলনায় কম। ৭ সপ্তাহ আগে প্রধানমন্ত্রী মে নির্বাচনের ডাক দেওয়ার সময় যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আশা করা হয়েছিল।

ইপসোস এমওআরআই এর প্রধান রাজনৈতিক গবেষক গাইডেওন স্কিনার বলেন, কনজারভেটিভরা গত সপ্তাহে জনসমর্থনের দিক থেকে মার খেয়েছে। তবে শেষ কয়েকদিনে তারা আবার পরিষ্কারভাবে অবস্থান সুসংহত করেছে।”

ব্রেক্সিটের পক্ষে ব্রিটেনবাসী গণভোট দেওয়ার পর যুক্তরাজ্যের এ আগাম নির্বাচনকে গোটা ইউরোপের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে দেখা হচ্ছে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার প্রক্রিয়া এবং এর বাইরেযুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সম্পর্ক, সীমান্ত ও শুল্ক ব্যবস্থাপনার ধরণ কোন পথে যাবে, তা এ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে।

আগাম নির্বাচনের কারণ ব্যাখ্যায় প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে বলেছিলেন, ব্রেক্সিট সামাল দেওয়ার মতো একটি নিশ্চিত, স্থিতিশীল ও শক্তিশালী সরকার প্রয়োজন। ব্রেক্সিট আলোচনায় নিজের অবস্থানকে আরওসুসংহত করতেই আগাম নির্বাচন দিয়েছেন তিনি।

নির্বাচনে প্রতিপক্ষ লেবার নেতা জেরেমি করবিনকে অর্থনীতি এবং ব্রেক্সিট সব ক্ষেত্রেই একজন দুর্বল এবং অসহায় নেতা হিসাবে তুলে ধরেছেন টেরিজা মে।

ব্রেক্সিট আলোচনা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় ইউরোপীয় ইউনিয়নেও অনেকে চাইছেন মে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করুন। ইইউ আইনপ্রণেতা রয়টার্সকে বলেছেন, “আমাদের ব্রেক্সিট আলোচনা চালানোর জন্য একটি শক্তিশালী সরকার প্রয়োজন।”

তবে অনেকেই আবার ব্রেক্সিট আলোচনায় যুক্তরাজ্যের নির্বাচনের প্রভাবকে অতটা আমলে নেননি।

“যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে বেশি বেশি টোরি (কনজারভেটিভ) এমপি’র জয় মানেই কি একটি ভাল ব্রেক্সিট চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া? ব্রাসেলসে আলোচনা টেবিলে যারা বসে আছেন তাদের জন্য এর কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই।” গার্ডিয়ান পত্রিকার মতামত কলামে এমনটিই মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রধান ব্রেক্সিট আলোচক।

মে এর আগে কয়েকটি বিষয় নিয়ে নেতৃত্বে দুর্বলতার পরিচয় দিয়ে জনসমর্থন হারিয়েছিলেন। বিরোধীরাও তখন শক্তিশালী নেতৃত্বের দাবিকে ভুল প্রমাণের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। ব্রেক্সিটের আগে মে যে যুক্তরাজ্যের ইইউ য়ে থাকার পক্ষে ছিলেন বিরোধীরা তখন সেটি নিয়েও কথা তুলে তার অবস্থানকে দুর্বল করার চেষ্টা নিয়েছিল। এরপর নির্বাচনি প্রচারণার মধ্যে দু’দফা সন্ত্রাসী হামলারপ্রেক্ষাপটে আলোচনায় চলে আসে সন্ত্রাসবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে পুলিশের বরাদ্দ কমানো নিয়েও সমালোচনা শিকার হন মে। কমে আসতে থাকে তার জনসমর্থন।

কিন্তু ভোটের আগে ফের ব্রেক্সিটে মনোযোগ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন মে।ভোটের আগমুহূর্ত পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তা ইস্যু থেকে মে চেষ্টা চালান ব্রেক্সিটকে পুনরায় সামনে নিয়ে আসার।

আর এখন ভোটের সম্ভাব্য ফল কি হতে পারে সেটিই দেখার বিষয়।

মে’র বিপুল জয়:

মে নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেলে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা কমতে পারে।

তাছাড়া আগাম নির্বাচনের ফলে যুক্তরাজ্যে পরবর্তী নির্বাচনের সময় ২০২০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ায় মে ব্রেক্সিট চুক্তি ঠিকঠাকমত সম্পন্ন করার জন্য অনেক সময় পাবেন এবং এতে করে চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা নিয়ে রাজনৈতিক ঝুঁকিও কমে আসতে পারে।

অনেকে আবার মনে করছেন, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে মে জয় পেলে তিনি ব্রাসেলসের সঙ্গে আপোস করতে পারেন। কট্টরপন্থিরা যার বিপক্ষে রয়েছে। যাদের কাছে অগ্রধিকার হিসাবে সামনে আছে অভিবাসন ও বাণিজ্যের মত বিষয়গুলো।

ইউএস ব্যাংক সিটি বলছে, মে’র দল ১শ’র বেশি আসনে জয় পেলে বিশৃঙ্খল ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার ঝুঁকি কমবে। তবে সেইসঙ্গে ইইউ একক মার্কেটে যুক্তরাজ্যের সদস্য থাকার সম্ভাবনাও কমবে।

সর্বোপরি কনজারভেটিভদের বিপুল জয়ে কঠিন হলেও নিশ্চিত হবে নির্বিঘ্ন ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া। এতে করে অনিশ্চয়তার ঝুঁকি কমবে।

১২ আসন বা তার কম সংখ্যাগরিষ্ঠতা:

মে ১২ আসন বা তার কম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেলে ব্রেক্সিট আলোচনায় তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে এবং পার্লামেন্টের মাধ্যমে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া নিয়ে অগ্রসর হতেও তিনি ঝামেলায় পড়বেন।

তবে অন্যদিকে, কম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের কারণে মে’র দেশে বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ কমে যাওয়ার কারণে তিনি ব্রাসেলসের আপোসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন এবং কঠোর দরকষাকষিতে যেতে পারবেন।

বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, মে’র কম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্রেক্সিট চুক্তির বিষয়টিকে অনিশ্চয়তায় ফেলবে।

ইউএস ব্যাংক সিটি বলছে, কনজারভেটিভরা ৪০ আসনের কম সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তা রাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।

কেউ পরিস্কার জয় না পেলে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের সম্ভাবনা:

নির্বাচনে কোনও পার্টিই পরিস্কার জয় না পেলে কে সরকার গঠন করবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে।

ইউগভের পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, বৃস্পতিবারের নির্বাচনে কনজারভেটিভরা ৪২ শতাংশ ভোট পেয়ে গতবারের চেয়ে ২৮টি কম আসনে জয় পেতে পারে। আর, লেবার পার্টি ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়ে গতবারের তুলনায় ৪০টি বেশি আসনে জয় পেতে পারে।

নির্বাচনের ফল সত্যি এমন হলে মে’র কনজারভেটিভ দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে। কোনও দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ফলে ঝুলন্ত সংসদ গঠনের পথে যেতে হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

ব্রেক্সিট নিয়ে কনজারভেটিভদের অবস্থন এবং কৃচ্ছ্র সাধনের মতো অন্যান্য দেশীয় ইস্যুর কারণে তাদের পক্ষে জোট সরকারের জন্য আগ্রহী শরিক পাওয়ার সম্ভাবনা কমে আসবে। এতে করে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট থেকে লেবার পার্টি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

আর ঝুলন্ত পার্লামেন্টই হোক বা লেবার নেতা জেরেমি করবিনই প্রধানমন্ত্রী হোন যাই হোক না কেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের আশঙ্কা এতে করে ব্রেক্সিট আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু করতে দেরী হবে। যে আলোচনা ১১ দিনের মধ্যেই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে তা পিছিয়ে যাবে।

সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহে লেবার এবং কনজারভেটিভদের মধ্যে জনমত জরিপে ব্যবধান কমে আসায় বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে কোনও দলই পরিষ্কার জয় না পাওয়ার আশঙ্কা আছে।