বো স্কুলের বৃটিশ-বাঙালি ছাত্র নাসের আহমেদের (১৪) অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্তের শুনানিতে তীব্র শ্বাস কষ্ট ও এলার্জিতে আক্রান্ত নাসের আহমদের ‘কেয়ার প্ল্যান’ ভুলভাবে তৈরি করার দায় স্বীকার করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স গড্ডার্ড এডওয়ার্ডস। গত ২ মে মঙ্গলবার পপলার করনার্স কোর্টে বিচার বিভাগীয় তদন্তের শুনানিতে নার্স এই দায় স্বীকার করেন।

গত বছরের ১০ নভেম্বর সহপাঠীদের সঙ্গে খেলার সময় স্কুলের ক্যাম্পাসে একটি ময়লার বিন উলটে ফেলে দিয়েছিল নাসের। তারই শাস্তি হিসাবে স্কুল শিক্ষকদের নির্দেশে একটি আলাদা কক্ষে (এক্সক্লুশন রুম) ডিটেনশনে রাখা হয়েছিল তাকে। ডিটেনশনে থাকা অবস্থায় জ্ঞান হারিয়ে স্কুল ক্যাম্পাসেই ঢলে পড়েছিল নাসের। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার দিন পর তার মৃত্যু হয়। শুনানি সূত্রে জানা যায়, নার্স গড্ডার্ড এডওয়ার্ডস স্কুলছাত্র নাসের আহমেদের এলার্জিকে ‘মাইলড’ থেকে ‘মডারেট’ (হালকা থেকে মাঝারী) এ উন্নীত করে এলার্জি প্ল্যান তৈরি করেছিলেন। অথচ নাসেরের এলার্জি প্রকৃতপক্ষে ছিল ‘সিভিয়ার’। কারণ বিভিন্ন ধরণের খাবারে তার এলার্জি ছিল এবং তাকে প্রয়োজনে ‘এপিপেন’ নামের একটি ওষুধ সেবন করতে হতো। শুধু তাই নয়, গত বছরের মে মাসে নাসের আহমেদ ও তার মায়ের সাথে বসে এডওয়ার্ডস নাসেরের এলার্জির মাত্রা পরীক্ষা করেছিলেন। সেদিন নার্স গড্ডার্ড নাসেরের তথ্য সংগ্রহ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে ভুল ফর্ম ব্যবহার করেছিলেন এবং ফলশ্রুতিতে তার এলার্জির মাত্রাকে কেয়ার প্ল্যানে অবনমন (ডাউনগ্রেড) করেছিলেন।

শুনানিতে আরো জানানো হয়, মিস্টার গড্ডার্ড স্কুলে রাখা নাসেরের ওষুধপত্র (মেডিকেশন) সংক্রান্ত অপূর্ণ তথ্যগুলোকে পূর্ণাঙ্গরূপে সন্নিবেশিত করতেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। ‘এপিপেন’ ব্যবহারের কথা কেয়ার প্ল্যানে উল্লেখ ছিলনা। গড্ডার্ড তার এই ভুল স্বীকার করেছেন। শুনানিতে তিনি বলেন, সেটি ছিল তার ‘অভারসাইড বা বেখেয়ালী ভুল’। স্কুলের রিসেপশনিস্টকে দিয়ে নাসেরের মাকে টেলিফোন করিয়ে নতুন ‘এপিপেন’ ও ‘ইনহেলার’ আনার জন্য বলেছিলেন নার্স গড্ডার্ড, কিন্তু তিনি তা নাসেরের কেয়ার প্লানে লিপিবদ্ধ করেননি। একই সাথে নাসেরের কেয়ার প্ল্যান পুনর্মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হওয়ার কথাও স্বীকার করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স।

নিজের ভুল স্বীকার করার পরও নাসেরের বিষয়ে তাঁর আন্তরিকতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শুনানিতে নার্স বলেন, ‘আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। আমি নাসেরকে যে সেবা দিয়েছি তাতে আমি সন্তুষ্ট’। তবে তার এই কথা শুনে করনার ম্যারি হ্যাসেল বলেন, এতোগুলো ভুল করার পরও নার্সের মুখে এমন কথা শুনে তিনি ‘বিস্মিত’ হয়েছেন। শুনানিতে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন বো স্কুলের শিক্ষিকা আর্লেট মাতুমোনা। তিনি ছাত্রদের চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। শুনানির এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এই কথা নিশ্চিত করতে পারেননি যে, নাসেরের ডিটেনশনের দেখাশোনায় নিয়োজিত স্টাফ স্কুলে রাখা তথ্য থেকে নাসেরের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন কি-না। শিক্ষিকা আর্লেট মাতুমোনা বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বছরের শুরুতে স্টাফদের বলে দেওয়া হয় তারা যেনো ছাত্রদের মেডিকেল রেকর্ড সম্পর্কে নিজেদের অবগত রাখেন। কিন্তু নাসেরের সাথে সেদিন যে স্টাফ ছিলেন তার সাথে প্রতিদিন নাসেরের দেখা হতোনা। এজন্য হয়তো নাসেরের বিষয়ে আলাদাভাবে খোঁজখবর নেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁরা ভাবেন না’।
তিনি আরো বলেন, ‘কোনো কোনো স্টাফ স্কুলে রাখা তথ্য সম্পর্কে অবগত হন, কেউবা সেই তথ্যের খোঁজখবর রাখেন না’। বো স্কুলের শিক্ষিকার এমন উত্তর শুনে নাসেরের পারিবারিক আইনজীবী স্যাম জেকব শিক্ষিকাকে প্রশ্ন করেন, সকল স্টাফের এ সংক্রান্ত তথ্য সম্পর্কে অবগত থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন কি-না? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না’। বছরের শুরুতে একজন ছাত্রের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য দেখার পর সারাবছর সেই তথ্য স্টাফদের মনে রাখার বিষয়টি কতোটা বাস্তব সম্মত- এমন এক প্রশ্নের জবাবে মাতুমোনা বলেন, ‘আমরা হয়তো এসব তথ্য কোথাও ডিসপ্লে (দৃশ্যমান) করে রাখতে পারি অথবা এক্সক্লুশনে থাকা ছাত্রদের আলাদা তালিকা তৈরি করতে পারি’। উল্লেখ্য, পপলার করনার্স কোর্টের শুনানি অব্যাহত রয়েছে।

সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার সৌজন্যে।