ফারুক আহমদ ।।

নজরুল ইসলাম বাসন মূলত একজন সাংবাদিক-কলামিস্ট। ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও বিলাতবাসের পর থেকে সাংবাদিকতা পেশায়ই নিয়োজিত ছিলেন, এখনো আছেন। সিলেট শহরকেন্দ্রীক জীবনযাপনের কারণে বাল্যকালে পাকিস্তানী রাজনীতির সভাসমাবেশ দেখেছেন, কিছুটা হলেও জেনেছেন, মুক্তিযুদ্ধও দেখেছেন। স্বাধীনাত্তোরকালে নিজে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে সত্তরের দশকের মধ্যভাগ থেকে আশির দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত এর পুরোভাগে ছিলেন। তখন সিলেটের স্বনামধন্য ছাত্রনেতাদের তালিকায় তিনিও একজন। লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে চা বাগানের সহকারী ম্যানেজার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও, পরে সোনার হরিণ ধরতে গিয়ে বিলাতবাসী হন। বিলাতে আসার আগে থেকেই আমি ছাত্রনেতা বাসনকে চিনতাম। এখানে আসার পরে সাংবাদিক হিসেবে তার সঙ্গে পরিচয়। আমি এসেছিলাম একটি সঙ্গীত প্রতিনিধি দলের স্ক্রিপরাইটার হিসেবে। সেজন্য নজরুল ইসলাম বাসন এসেছিলেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে, সংগীত প্রতিনিধি দলের খবরটি সংগ্রহ করতে। সাপ্তাহিক সুরমায় আমাদের সে খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯০ সালের ১২ জানুয়ারি। তখন তিনি সাপ্তাহিক সুরমার বার্তা-সম্পাদক, পুরোদস্তুর সাংবাদিক। লন্ডনেও একনামে সবাই তাকে চেনেন। পেশার বাইরেও তিনি একজন সুন্দর মনের মানুষ। লন্ডনে সক্রিয়ভাবে সাংবাদিকতায় পেশায় যোগদানের আগে সিলেটের ছাত্ররাজনীতি নিয়ে সাপ্তাহিক জনমতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত তার একটি লেখা তখন বেশ জনপ্রিয় ছিয়েছিল বলেও লন্ডনে এসে শুনেছি। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে সাপ্তাহিক জনমতের আর্কাইভ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তার মূল্যবান তথ্যসমৃদ্ধ লেখাগুলো পড়েছি। সেজন্য বেশ কয়েক বার, এমনকী তার অবসর নেয়ার পরেও এ নিয়ে বই লেখারও অনুরোধ করেছি। কিন্তু কেন জানি ‘ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়’-এর মতো তিনি এ পথ মাড়াতে চাননি, এখনো না।

গত ৮ নভেম্বর (২০১৬) নজরুল ইসলাম বাসন আমাকে ফোন করে জানালেন সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি বই লিখছেন। সেজন্য আমার লেখা এবং সদ্য প্রকাশিত ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস’ গ্রন্থের মুক্তিযুদ্ধের ওপর অধ্যায়ের টাইপকরা কপিটি দরকার। তথ্যগুলো তিনি তার প্রকাশিতব্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি বইয়ে ব্যবহার করতে চান, কিন্তু টাইপিংয়ের ঝামেলায় যেতে চান না। অধ্যায়টি পাঠালাম। তার কিছুদিন পরেই তিনি বাংলাদেশে চলে যান। দীর্ঘ প্রায় তিন মাস পরে এসে গত ১৫ মার্চ (২০১৭), বিকেল ৪-২ মিনিটে ফোন দিয়ে জানালেন, “বইটি বের হয়ে গেছে। আপনার কপিটি সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে রেখে এসেছি। এর ওপর একটি রিভিউ চাই।” আরও জানালেন এ বইটির প্রকাশনা তার একটি মিশনের অংশ। সিলেটের বেশ কয়েকটি মাধ্যমিক স্কুলে বইটি দিয়ে এসেছেন। তার ইচ্ছে, প্রত্যেকটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত ১০টি করে বই দেয়া। সেজন্য প্রকাশনা উৎসব করে অযথা টাকা খরচ করতে চান না। শুনে অনেকটা শিহরণ অনুভব করেছি, তার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত করেছি, ধন্যবাদজ্ঞাপন করেছি এবং পরের দিনই বইটি সংগ্রহ করেছি।

আমার অভ্যাস হল, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস কিংবা গবেষণাধর্মী কোনো লেখা পেলে এটা পড়া শেষ না করা পর্যন্ত পেটে ভাত হজম হয় না। তাই বইটি সংগ্রহ করে নিয়ে আসার দিনই পড়া শেষ করি। কিন্তু পড়তে গিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন বার বার আমাকে তাড়া করেছে। সেগুলো হল: এক: বইটির নাম ‘দি ব্যাটল অব সিলেট’ কেন? পাঠক এ নামটি পড়ে কী বুঝবেন? অর্থাৎ এটি হযরত শাহজালাল (র.)-এর সঙ্গে রাজা গৌড় গোবিন্দের যুদ্ধ, মোঘল আমলে সিলেটের কমলগঞ্জে সংঘঠিত দৌলাম্ভপুরের যুদ্ধ, ব্রিটিশ শাসনামলে শাহী ঈদগা ময়দানে অনুষ্ঠিত সৈয়দ হাদি ও সৈয়দ মেহদির ব্রিটিশ-বিরোধী যুদ্ধ, নাকি ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত আমাদের যুদ্ধ? অর্থাৎ কোন যুদ্ধ? নামটি নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন ছিল। আমার ধারণা এটা হতে পারতো, ‘দ্য ব্যাটল অব সিলেট: ১৯৭১’ অথবা ‘১৯৭১: দ্য ব্যাটল অব সিলেট’। তাহলে পাঠককে বিভ্রান্তিতে পড়তে হত না। 

দুই: নজরুল ইসলাম বাসন জীবনের স্বর্ণালী দিনগুলোতে মেহনতি মানুষের মুখে হাসি ফুটাবার রাজনীতি করলেও এক সময় মিলিটারি শাসক জিয়াউর রহমানের বুর্জোয়া রাজনীতিতে দীক্ষা নিয়ে, ধানের বোঝা মাথায় তুলে: অনেকের মতে; নিজের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনকে বিতর্কিত করলেও বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সব সময় বুকে ধারণ ও লালন করে আসছেন। বিলাতেও বাংলা ভাষাকে মাধ্যমিক স্কুলগুলোর পাঠ্যসূচিভুক্ত করার আন্দোলন থেকে আরম্ভ করে বাংলা ভাষাকে বিলাতে টিকিয়ে রাখার সকল প্রচেষ্টার সঙ্গে তিনি কমবেশি জড়িত ছিলেন ও আছেন। তার অভিজ্ঞতার ভা-ারও অনেক বড়। অথচ এই মানুষটি কেনইবা এ বাংলা বইটির নামকরণ ইংরেজিতে করতে গেলেন? এই প্রশ্নগুলো বইটি বাজারে বের হবার পর থেকেই নানা জনের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে, আগামীতেও হবে। এ ব্যাপারে লেখকের কাছে যুক্তি হয়ত আছে। কিন্তু যে যুক্তিই হোক, তা খোঁড়া হতে বাধ্য, কারণ এটা তার চরিত্রের সঙ্গে যায় না। 

তিন: আমার ধারণা ছিল একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি নিজে মুক্তিযুদ্ধের ওপর বই লিখছেন। অথবা ‘মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের ভূমিকা’ নিয়ে এটা তার গবেষণামূলক কাজ। বইটির নামও কমবেশি তা জানান দিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা তার লেখা নয়, বিভিন্ন লেখকের লেখা এবং প্রকাশিত বই থেকে হুবহু সংকলন। যা আমাকে রীতিমত হতাশ করেছে। এ ধরণের কাজ ইতঃপূর্বে আমি কখনো দেখেছি বলেও মনে হয় না। এ বইটি ইউরোপের কোনো দেশে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হলে এতো দিনে সংকলক ও প্রকাশক উভয়েই কপিরাইট আইনের গ্যাড়াকলে পড়ে যেতেন, খেসারতি দিতেন। এমনকী এ বইটি নিয়েও যে তিনি ও প্রকাশক ভবিষ্যতে কোনো ঝামেলায় পড়বেন না তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না! কারণ, কোনো প্রবন্ধ-নিবন্ধ অনেক সময় লেখকের অনুমতি না নিয়েও নাম উল্লেখপূর্বক প্রকাশ করা যায়। কিন্তু প্রকাশিত বই থেকে নিয়ে এসে এভাবে বই করা যায় না। সেখানে লেখকের পাশাপাশি মুল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক লাভ-লোকসানের প্রশ্নটিও জড়িত। কোনো লেখক ইচ্ছা করলেও এ ধরণের কাজে অনুমতি দিতে পারেন না। 

চার: গ্রন্থটির সূচি সাজানোর পদ্ধতি আমাকে হতাশ করেছে, অগোছালো মনে হয়েছে। যেমন ‘মুক্তিযুদ্ধ রূপকথা বা কল্পকাহিনী নয়’ এটা কি ভূমিকা? তা হলে তা, এর পরে দেয়া সূচিতে তা আসবে কেন? বইটি শুরু হয়েছে হযরত শাহজালাল (র.)-এর সিলেট আসার পথ ধরে। তার পরে আছে ‘ব্রিটিশ-ভারতে সিলেটের রেফারেন্ডাম: মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের রাজনৈতিক লড়াই’,‘ব্রিটিশ আমলের মুসলিম লীগ নেতা: আব্দুল মতিন চৌধুরী, সিলেটে গণভোট বা রেফান্ডেম অনুষ্ঠিত’, ‘সিলেটে পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন’, ‘সিলেটে মুসলিম ছাত্রলীগ সিলেট জেলা শাখা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহর’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

এখানে লেখক রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর একটি পূর্বাপর বিবরণ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এই আলোচনায় না গিয়ে আমার প্রশ্ন হচ্ছে যে, এই রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে আব্দুল মতিন চৌধুরীর কথা শিরোনাম দিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে আসবে কেন? তার কথা আসবে যেভাবে জিন্নাহ,গান্ধী বা অন্যান্য সর্বভারতীয় নেতার কথা এসেছে, সেভাবে, টেক্স-এর মধ্যে। আব্দুল মতিন চৌধুরীর কথা লিখতে গিয়ে এক পর্যায়ে লেখক উল্লেখ করেছেন, “যেহেতু সিলেট ছিল আসাম প্রদেশের অংশ তাই আসাম থেকেই সিলেটের রাজনীতি পরিচালিত হতো। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও করিমগঞ্জ-এর রাজনীতি পরিচালনা করার জন্য ১৯৩৬ সালে মি. জিন্নাহ সিলেট জেলার ভাদেশ্বরের আব্দুল মতিন চৌধুরীকে আসাম প্রদেশের দায়িত্ব দিলেন। তিনি মওলানা শাখাওয়াতুল আম্বিয়াকে সেক্রেটারির দায়িত্ব দিলেন। সিলেটের ভাদেশ্বরের পিতৃভিটা থেকে তিনি আসাম প্রদেশ মুসলিম লীগের কার্যক্রম শুরু করলেন। এ সময় তাকে মুসলিম লীগ নেতা আব্দুল্লার বিরোধিতার সম্মুখিন হতে হয়। মতিন চৌধুরী জিন্নার কাছে সাহায্য চেয়ে পত্র লিখেন (পৃ.-১৫-১৬)”। 

এবার উল্লিখিত চারটি লাইন নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রথমত বাক্যগুলো সুগঠিত নয়। দ্বিতীয়ত এই লাইনগুলো পড়ে মনে হচ্ছে আসামের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে লেখক খুব একটা ওয়াকিবহালও নন। নতুবা ‘সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও করিমগঞ্জ-এর রাজনীতি পরিচালনা করার জন্য ১৯৩৬ সালে মি. জিন্নাহ সিলেট জেলার ভাদেশ্বরের আব্দুল মতিন চৌধুরীকে আসাম প্রদেশের দায়িত্ব দিলেন।’ এই কথাগুলো লিখতেন না। প্রশ্ন হচ্ছে উল্লিখিত স্থানগুলো নিয়েই কি আসাম প্রদেশ? আসলে এই ভুল শুধু তিনি এই প্রথম করেননি, বিলাতবাসী ইউসুফ চৌধুরী, আনসার আহমদ উল্লাহ, প্রফেসর গোলাম মুর্শিদসহ আরও অনেকে করেছেন। দ্বিতীয়ত আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানে মনে হয়, আব্দুল মতিন চৌধুরী কত বড় মাপের নেতা ছিলেন এটা যেমন লেখক ধারণ করতে পারেননি, তেমনি তথ্য উপস্থাপনও বিভ্রান্তিকর। মতিন চৌধুরীর ভূমিকাকে বড় করে দেখাতে গিয়ে বরং তাকে ছোট করেই দেখিয়েছেন। কারণ, ১৯২৬ সালের আসাম লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির নির্বাচনে তিনি নন-অফিশিয়াল মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হন। একই নির্বাচনে বোম্বে সিটি মুসলিম সদস্য হিসেবে অ্যাসেমব্লিতে নির্বাচিত সদস্য ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ফলে উভয়ে একে-অপরের সংস্পর্শে আসেন এবং এই সূত্রেই আব্দুল মতিন চৌধুরী জিন্নাহর নবগঠিত ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৩০ সালের নির্বাচনে আব্দুল মতিন চৌধুরী পুনরায় আসাম থেকে মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হন (দ্য টাইম্স, জুলাই ২৬, ১৯৩০)। ১৯৩১ সালে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ নিরসনে ব্যর্থ হয়ে জিন্নাহ লন্ডনে তার পুরনো পেশায় ফিলে গেলেও ভারতীয় রাজনীতির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকার জন্য আব্দুল মতিন চৌধুরীর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ১৯৩২ সালের তৃতীয় লন্ডন গোল টেবিল অধিবেশনে (১৭ নভেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর) আব্দুল মতিন চৌধুরী হায়দরাবাদ স্টেইটের প্রধানমন্ত্রী স্যার মোহাম্মদ আকবর নাজার আলী হায়দারির উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৩৩ সালে তিনি আসাম প্রদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সে সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাকে লন্ডন থেকে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে যাদের বিশেষ ভূমিকা ছিল, আব্দুল মতিন চৌধুরী তার অন্যতম। ১৯৩৪ সালের নির্বাচনে আব্দুল মতিন চৌধুরী আবারো লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন (দ্য টাইম্স, ডিসেম্বর ১০, ১৯৩৪)। ১৯৩৬ সালে তিনি মুসলিম লীগ সেন্ট্রল পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালে তিনি আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তারও আগে ১৯৩০ সালে আসাম মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। 

এছাড়া তিনি ভাদেশ্বরের পিতৃভিটা থেকে আসাম প্রদেশ মুসলিম লীগের কার্যক্রম শুরু করেননি, করেছেন কলকাতা এবং আসামের তৎকালীন রাজধানী শিলং থেকে। সিলেটে আসতেন মাঝেমধ্যে। 

এর পরে অর্থাৎ ১৭ পৃষ্ঠা থেকে পুরো বইটিই এম এ মুনিমের (রেণু লুৎফা ও ফারুক আহমদ সম্পাদিত) ‘সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের গোড়ার কথা’; ফারুক আহমদের ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস’; মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসির, ‘একাত্তরের বিশটি ভয়াবহ যুদ্ধ’; মকসুদ ইবনে আজিজ লামার লেখা প্রবন্ধ, ‘আমার বড় প্রিয় স্বাধীনতা’; পাকিস্তাানী মেজর (অব.) মুমতাজ হোসেনই শাহ-এর লেখা ‘দ্য ব্যাটল অব সিলেট ফরট্রেস’; প্রফেসর আব্দুল আজিজের ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সর্বাধিনায়ক ওসমানী’; এবং সুসান ব্রাউন মিলারের, ‘এগেইন্সট উইল ম্যান-উইম্যান অ্যান্ড রেইপ’; ইয়াসমিন সাইকির ‘উইম্যান, ওয়ার অ্যান্ড দ্য মেইকিং অব বাংলাদেশ: রিমেম্বারিং ১৯৭১’ ইত্যাদির অনুবাদ তাদের নাম উল্লেখপূর্বক লেখার সংকলন। কিন্তু সিলেটের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন ‘দ্য ব্যাটল অব পীরগঞ্জ অ্যান্ড বগুড়া’ শিরোনামে মেজর জেনারেল ইয়ান কার্ডোজোর ইংরেজিতে লেখা কাহিনী যোগ করা হল তা বুঝা গেল না।

এক্ষেত্রে প্রধান প্রধান বিষয়গুলোকে বিভিন্ন অধ্যায়ে ভাগ করে উপ-শিরোনামগুলো সাজানো হলে ভাল হতো। ভাল হতো অধ্যায়ের নিচে লেখকের নাম যোগ না করে প্রথমে উল্লেখ করলে। এতে সংশ্লিষ্ট লেখকের লেখা কোথায় শেষ হয়েছে তাও পরিষ্কার হতো। অধ্যায়গুলো হুবহু সংকলনের কারণে- বিশেষ করে আমার লেখাটির মধ্যে তথ্যসূত্র দেখে পাঠক বিভ্রান্তির সম্মুখীন হতে পারেন। এ ধরণের তথ্যসূত্র ব্যবহারে বইয়ের শেষে সাধারণত গ্রন্থ তালিকা যোগ করা হয় যাতে আগ্রহী পাঠক বুঝতে ও যাচাই করতে পারেন তথ্যগুলো কোন গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে এবং সেগুলো সঠিক কি না। এক্ষেত্রে সূত্রগুলো তুলে দেয়াই যুক্তিযুক্ত ছিল।

এবার লেখকের মিশনের কথায় আসা যাক। এ বিষয়ে প্রথমেই বলবো নিঃসন্দেহে স্কুলে বই বিতরণ একটি ভালো উদ্যোগ এবং তা যদি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই হয় তাহলো আরও ভালো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এটি কি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপযোগী বই? আমার ধারণা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপযোগী বই নয়, এবং এটি পড়ে তারা বুঝতে পারবে বলে মনে হয় না। বরং এটি কলেজ ছাত্রছাত্রীদের পড়ার উপেযোগী বলে বিবেচিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত এ মহৎ কাজটি লেখক অন্যভাবেও করতে পারতেন। যেমন এত পরিশ্রম ও টাকা খরচ না করে বরং যে দশটি বই থেকে লেখাগুলো হুবহু সংকলন করেছেন, সেই দশটি বই কিনে প্রত্যেকটি স্কুল অথবা কলেজে দান করলে খরচ যেমন কম পড়ত, তেমনি তার দেয়াটাও স্বার্থক হত। 

পরিশেষে বলব, কোনো কিছু লিখলেই তা লেখা হয়ে ওঠে না, লেখাতে জারণ প্রয়োজন। এ গ্রন্থটিতে জারণ না থাকলেও সাধারণ পাঠক এটি থেকে অনেকগুলো বইয়ের স্বাদ পাবেন। বইটি প্রকাশ করেছেন পাণ্ডুলিপি প্রকাশন, সিলেট। প্রকাশ কাল ফেব্রুয়ারি ২০১৭। প্রচ্ছদ মোটামুট ধরণের। ছাপা ও বাধাই ভাল। ২২৪ পৃষ্ঠার সাদা কাগজে মুদ্রিত বইটির মূল্য রাখা হয়েছে পাঁচশত টাকা।

নজরুল ইসলাম বাসন বর্তমানে অবসর জীবন-যাপন করছেন। তার কাছ থেকে আমরা এ ধরণের সংকলন নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ, তথ্যবহুল ও গবেষণাধর্মী বই প্রত্যাশা করি। আশাকরি আগামীতে তিনি আমাদের এ প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করবেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘বাঙালিতে বাংলার ইতিহাস। যে যাই লিখুক তা মাতৃপদে পুষ্পাঞ্জলি। যে সোনারূপ জোটাইতে পারিল না সে কি বনফুল দিয়েও মাতৃপদে পুষ্পাঞ্জলি দেবে না?’ 

‘দি ব্যাটল অব সিলেট’ গ্রন্থটি অবশ্যই তথ্যবহুল একটি গ্রন্থ। এতে মূল্যবান তথ্যের যোগান আছে। মাতৃপদে পুষ্পাঞ্জলি হিসেবে আমি বইটির বহুল প্রচার কামনা করি। 

ফারুক আহমদ ; লেখক ও গবেষক, লন্ডন।