সিবিএনএ কানাডা থেকে।।    
ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে কানাডার অটোয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন মহান স্বাধীনতার ৪৬তম বার্ষিকী ও জাতীয় দিবস উদযাপন করেছে। উদযাপন কর্মসূচীর প্রথম অংশ হিসেবে ২৬শে মার্চ সকালে বাংলাদেশ হাউসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের মান্যবর হাইকমিশনার মিজানুর রহমান। এ সময় দূতাবাসের সকল কূটনীতিক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। পরে বাংলাদেশ হাউসে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।  ঢাকা থেকে প্রেরিত মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাণী পাঠ করা হয়। বাণীসমূহ পাঠ করেন যথাক্রমে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার নাইম উদ্দিন আহমেদ,কাউন্সিলর মাকসুদ খান, প্রথম সচিব আলাউদ্দিন ভুঁইয়া এবং প্রথম সচিব অপর্ণা রাণী পাল। এরপর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৭৫ এর কালরাতের সকল শহীদের আত্মার মাগফিরাত এবং দেশ পরিচালনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করে ফাতিহা পাঠ ও মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন দুতাবাসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল ইসলাম। 

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে ২৮শে মার্চ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরীর ঐতিহ্যবাহী ফেয়ারমন্ট শ্যাতো লরিয়ার হোটেলের এডাম হলে এক আনুষ্ঠানিক সম্বর্ধনার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী, জেনারেল এন্ড্রু লেসলি এমপি। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিবৃন্দকে স্বাগত জানান কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের মান্যবর হাই কমিশনার মিজানুর রহমান, তাঁর সহধর্মিনী মিসেস নিশাত রহমান ও দূতাবাসের মিনিস্টার নাইম উদ্দিন আহমেদ। সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে কানাডার সংসদ সদস্য ও সিনেটরগণ, গ্লোবাল এ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ, অটোয়ায় অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারগণ, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধাগণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ, নেতৃস্থানীয় কানাডীয় সমাজকর্মীবৃন্দ, শিল্পী-সাহিত্যিকগণ, বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রী গবেষক এবং চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারী চাকুরীজীবী ও উদ্যোক্তাসহ বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত বিশিষ্ট কানাডীয় নাগরিকগণ যোগদান করেন। 

স্বাগত বক্তব্যে কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ-কানাডা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কানাডার অকুণ্ঠ সহযোগিতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ঐতিহাসিক সেই সম্পর্কের বন্ধন আজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সারা বিশ্বে তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ হচ্ছে কানাডার দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহের উৎসহ। অন্যদিকে, কানাডার সাস্কাচুয়ান ও এ্যালবার্টা প্রদেশ হতে প্রচুর পরিমাণে মসুর ডাল, ক্যানোলা তেল এবং পটাশ সার আমদানী করছে বাংলাদেশ। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বর্তমানে ২.৪ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। ঢাকা-টরন্টো বিমান চলাচল চুক্তি সম্পাদনের জন্য উভয় দেশ কাজ করছে। একটি বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির বিষয়টিও আলোচনাধীন রয়েছে। এছাড়াও দু’দেশের পররাষ্ট্র বিভাগের মধ্যে নিয়িমত আলোচনার জন্য ফরেন অফিস কন্সালটেশনের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রচেষ্টা চলমান। তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের লক্ষে মাননীয় প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার কাজ করে চলেছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক কানাডা সফর এবং তার পরের মাসেই মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ.এইচ. মাহমুদ আলীর সফরের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে।  জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আত্মদানকারী সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে হাই কমিশনার বলেন, লাখো শহীদের আত্মত্যাগের সেই মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বিজয় তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে যখন আমরা প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় একটি শক্তিশালী অর্থনীতির উপর দাঁড়াতে পারবো। সেজন্য তিনি কানাডা সরকার, কানাডীয় কোম্পানীসমূহ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের বাংলাদেশে অধিকতর বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।কানাডায় বসবাসকারী এক লক্ষাধিক বাংলাদেশী, যাঁরা দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে কানাডার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, তাঁদের প্রশংসা করে এদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর করার ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য আহবান জানান বাংলাদেশের হাইকমিশনার। 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী এন্ড্রু লেসলি এমপি এম.পি. বলেন, কানাডার কাছে বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্রমবর্ধিঞ্চু। এমন প্রেক্ষাপটে গত বছর বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে দু’দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। জনাব এন্ড্রু লেসলি বলেন, তাঁর কাছে বাংলাদেশের একটি বিশেষ আবেদন রয়েছে এজন্যই যে তাঁর নির্বাচনী এলাকা অরলিন্স -এর বিপুল সংখ্যক ভোটার হচ্ছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত কানাডীয়ান, যাঁরা সাফল্যের সাথে কানাডার উন্নয়নে অবদান রাখছেন। তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাবেন তিনি। সেই সাথে কানাডা-বাংলাদেশ দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক যাতে আরও জোরদার হয় এবং উভয় দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা যাতে আরও বাড়ে সে লক্ষ্যে তাঁর পক্ষ থেকে সব রকম সহযোগিতা থাকবে বলে তিনি জানান। তাঁকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান জেনারেল এন্ড্রু লেসলি এমপি। কানাডা-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক কূটেনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার উল্লেখ করে এন্ড্রু লেসলি বলেন, আগামী দিনগুলোতে এ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। 

আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পর বাংলাদেশের হাইকমিশনার, মিসেস নিশাত রহমান এবং প্রধান অতিথি এন্ড্রু লেসলী বাংলাদেশ-কানাডা দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বপুর্ণ সুসম্পর্ক কামনা করে টোস্ট করেন। এরপর উভয় দেশের বন্ধুত্বের প্রতীক অঙ্কিত কেক একত্রে কেটে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসকে উদযাপন করেন হাইকমিশনার মিজানুর রহমান, তাঁর সহধর্মিনী মিসেস নিশাত রহমান এবং অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জেনারেল এন্ড্রু লেসলী এমপি। 

সম্বর্ধনা শেষ অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়। বাংলা-ইংরেজি-ফরাসী ত্রিভাষিক উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানের ঘোষণা করেন প্রথম সচিব (বাণিজ্যিক) দেওয়ান মাহমুদ। সার্বিক সমন্বয়ে ও ব্যবস্থাপনায় ছিলেন মিনিস্টার নাইম উদ্দিন আহমেদ ও প্রথম সচিব আলাউদ্দিন ভুঁইয়া। অতিথি সমন্বয় ও সংযোগ করেন প্রথম সচিব অপর্ণা রাণী পাল ও প্রথম সচিব মোঃ সাখাওয়াত হোসেন। হাই কমিশনের সকল কূটনীতিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ তাঁদের পরিবারের সদস্যবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে অভ্যাগত অতিথিদের সাথে কুশল বিনিময় করেন।