নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি আদায় বা সরকার পতনের লক্ষ্যে নয়, শুধু জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আগামী মাসেই রাজপথে নামতে চায় বিএনপি। স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে ঢাকা বা এর আশপাশে সমাবেশের মাধ্যমে বড় ধরনের শোডাউন করারও পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
বিএনপির সিনিয়র এক নেতা জানান, জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ার কারণে বর্তমান সরকারের জনগণের প্রতি কোনো দায়িত্ব নেই, দরদও নেই। তারা যা খুশি তা করছে। আর বিএনপিও জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য অতিরিক্তি মনোনিবেশ করায় জনগণ এতদিন একেবারেই উপেক্ষিত ছিল। তাই এখন বিএনপির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, আপাতত জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ার। এজন্য মার্চ মাসে জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানের দাবিতে মার্চের শুরু থেকে সভা-সমাবেশ, সেমিনারা, মানববন্ধনসহ ছোট পরিসরে কর্মসূচি দেয়া হবে। আর স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে ঢাকা বা এর আশপাশে বড় সমাবেশ করা হবে। সেখান থেকে জনগণের সমস্যা সমাধানের জন্য আন্দোলনের বড় কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেন বিএনপি চেয়াপারসন খালেদা জিয়া।

বিএনপি সূত্রমতে, দল সমর্থিত কয়েজন বুদ্ধিজীবী বেশ কিছুদিন ধরেই জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আন্দালনে নামতে বিএনপি হাইকমান্ডকে পরামর্শ দিয়ে আসছেন। বিএনপি বিষয়টি এত দিন আমলে না নিলেও এখন অবস্থার পরিবর্তন এনেছে।

এক বুদ্ধিজীবী জানান, জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ইস্যুর প্রতি গুরুত্ব কম দেয়ায় বিএনপির কর্মসূচি সফলের ক্ষেত্রে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু এখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করাই বিএনপির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। এতদিন বিএনপি বিষয়টি বেশি গুরুত্ব না দিলেও এখন জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সব ইস্যুতে সরব হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবনের রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ, জঙ্গি দমন, নিত্যপণ্য কৃষি উপকরণের মূল্য হ্রাস, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল, বেকার সমস্যা সমাধান, ব্যাংেকর লোপাট হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ, বিদেশে শ্রমবাজার বাড়ানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও গুম-খুন বন্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে মার্চের শুরু থেকেই রাজপথে সরব হবে বিএনপি।

সূত্রমতে, জাতীয় ইস্যুতে আন্দোলনের ফাঁকে দলের তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে বিএনপি। এগুলো হচ্ছে_সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের আদালত থেকে রাজপথমুখী করা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে সরকারের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত বৃদ্ধি করা।

এ বিষয়ে বিএনপির মধ্য সারির প্রভাবশালী এক নেতা জানান, তিনটি লক্ষ্য বাস্তবায়নে এরই মধ্যে ৩০ জেলা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে বাকি কমিটিগুলোও গঠন করার জন্য কাজ চলছে জোরেশোরে। আর ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে দুই দফা আন্দোলনসহ গত আট বছরে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া প্রায় ২১ হাজার মামলা আইনীভাবে মোকাবেলা করা হচ্ছে। মামলাগুলোর কারণে নেতাকর্মীদের বেশির ভাগ সময় থাকতে হচ্ছে আদালত চত্বরে। তাই মামলার বিষয়টি কিছুটা সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলনে না যাওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এ ছাড়া দলের কূটনৈতিক উইংকে আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যাতে সহায়ক সরকারের দাবি আদায়ে বহির্বিশ্ব থেকে সরকারকে চাপে রাখা যায়। তবে বর্তমানে বিএনপির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণর্ বিষয় হচ্ছে, নাগরিক জীবনের সব ধরনের সংকট মোকাবেলায় জনগণের পাশে থাকা।

এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি জনগণের জন্য রাজনীতি করে। জনদুর্ভোগ লাঘবে সবসময় বিএনপি জনগণের সঙ্গে ছিল, আছে এবং থাকবে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা জনদুর্ভোগ লাঘবের কোনো চিন্তা নেই। বিদ্যুৎ-গ্যসের মূল্যবৃদ্ধিসহ সরকার একের পর এক জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের অযৌক্তিক ও অমানবিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিএনপি অবস্থান নেবে। আর যথাসময়ে কর্মসূচিও ঘোষণা করা হবে।