রামেন্দু মজুমদার।।

১৯৭০ সালে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ‘মাতৃভাষা’ শীর্ষক একটি নাতিদীর্ঘ নিবন্ধে লিখেছিলেন, ‘আমার মাতৃভাষা কী? বাংলা ভাষা। সমগ্র বাংলা ভাষা। বিচিত্ররূপিণী বাংলা ভাষা। অভিধানে আছে ষোড়শ রমণী মাতৃসম্বোধনীযোগ্য। শ্মশ্রূ থেকে তনয়া, গর্ভধারিণী থেকে পিতৃরমণী। ষোলো নয়, আমার মাতৃভাষার ষোলো শত রূপ। তারা সব পদ্মিনীর সহচরী। আমার মাতৃভাষা তিব্বতের গুহাচারী, মনসার দর্পচূর্ণকারী, আরাকানের রাজসভার মণিময় অলংকার, বরেন্দ্রভূমির বাউলের উদাস আহ্বান। মাইকেল-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ইসলাম আমার মাতৃভাষা। আমার মাতৃভাষা বাংলা ভাষা। ’ আজ আমাদের মাতৃভাষা বাংলার যে গৌরব বিশ্বচরাচরে উদ্ভাসিত হচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। আসলে আমাদের এই ভূখণ্ডে সংগ্রাম ছাড়া কোনো কিছুই অর্জিত হয়নি।

১৯৪৭ সালে আমরা পাকিস্তান হাসিলের আনন্দে আত্মহারা, যদিও আজাদির অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হলো। আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, আসলে আমরা স্বাধীনতা পাইনি, আমাদের কেবল প্রভুবদল হয়েছে। ইংরেজের জায়গায় পশ্চিম পাকিস্তানি। সরকারি কাজকর্মে ইংরেজির সঙ্গে উর্দু। ১৯৪৮ সালে করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনেই কুমিল্লার কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রস্তাব করেন, পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা হিসেবে ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলাও ব্যবহার করা হোক। উল্লেখ্য, তখন কেবল ইংরেজি বা উর্দুতে গণপরিষদে বক্তৃতা করা যেত। পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সব মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যও বাংলার অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে ভোট দেন। ফলে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় না। অথচ তখন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষীর সংখ্যা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ।

১৯৪৮ সালে যখন কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বলে ঢাকায় ঘোষণা দেন, তখন থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবীমহলে শুরু হয়ে যায়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালে আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথ ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ আত্মদান আজ এক গৌরবের ইতিহাস হয়ে আছে।

তবে একটি কথা আমাদের ভুললে চলবে না যে বাংলা ভাষার জন্য কেবল বাংলাদেশের বাঙালি রক্ত দেয়নি, ভারতের অসম রাজ্যের শিলচর ও করিমগঞ্জের বাঙালিদেরও বিরাট আত্মবলিদান রয়েছে। ১৯৬১ সালে শিলচরে মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন ১১ জন এবং করিমগঞ্জে ১৯৭২ সালে একজন ও ১৯৮৬ সালে দুজন প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন।

এ কথা আজ আমরা সবাই মানি যে একুশের পথ বেয়েই এসেছে আমাদের স্বাধীনতা। আর এই যাত্রাপথের কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে এক পবিত্র দিন। আমাদের সব সংকটে আমরা শহীদ মিনারের পাদদেশে সমবেত হই, একুশের চেতনা থেকে শক্তি সঞ্চয় করি। একুশ আমাদের সাহসী হওয়ার দীক্ষা দিয়েছে, প্রতিবাদী হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে।

আমাদের শহীদ দিবস আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ২১ ফেব্রুয়ারির এই বিশ্বস্বীকৃতি আমাদের দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে, বিশ্বের সব বাঙালিকে গর্বিত করেছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর প্রধান তাত্পর্য হচ্ছে, সব দেশে সবার মাতৃভাষার অধিকার, চর্চা, প্রসার ও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করা। পৃথিবীতে ছয় হাজারেরও বেশি ভাষা আছে বলে মনে করা হয়। একটি সমীক্ষায় আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, কারণ এই ৯০ শতাংশ ভাষায় বর্তমানে এক লাখেরও কম মানুষ কথা বলে। সুতরাং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এসব ভাষা যাতে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে সচেতন করবে।

আজ আমরা সমাজের যে যেখানে অবস্থান করছি, বিশ্বে আমাদের যা কিছু পরিচিতি ও সম্মান, তা সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেই। এ বিষয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। দুর্ভাগ্য আমাদের, স্বাধীনতার জন্য এত মূল্য দেওয়ার পরও আমাদের দেশের একটা অংশ পাকিস্তানি ভাবধারা লালন করছে, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদকে সরাসরি সমর্থন করছে, দেশকে তারা আবার অন্ধকার যুগে নেওয়ার আয়োজনে লিপ্ত। বিরুদ্ধ পরিবেশের মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছে। এটা সম্ভব হচ্ছে দেশপ্রেমিক সাধারণ মানুষের জন্য, যাদের হৃদয়ে ফেব্রুয়ারি ও একাত্তরের চেতনা চিরজাগরূক।

একুশে এলে আমরা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির দিকে দৃষ্টি ফেরাই। এবারের একুশেতে যে ঘটনাটি আমাদের ক্ষুব্ধ করেছে তা হচ্ছে, পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রতিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তন যে কী ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে আসবে আমাদের আগামী প্রজন্মে, তা আমরা এখন কল্পনাও করতে পারি না। পত্রপত্রিকার মারফত আমরা সবাই অবগত হয়েছি যে হেফাজতের দাবি অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্য বই থেকে ১৭টি রচনা বাদ দিয়েছে। সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। আমাদের বাঙালির যে অসাম্প্রদায়িক মানবিক ঐতিহ্য, তা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।

ফল কী হবে? আমরা একটা সাম্প্রদায়িক সমাজের, বিভক্ত সমাজের জন্ম দেব। শিশুকাল থেকেই একটি শিশু ধর্ম পরিচয়ে মানুষকে আলাদা ভাবতে শুরু করবে। নিজ ধর্মকেই শ্রেষ্ঠ মনে করবে, অন্য ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শিখবে না।

হেফাজত যদি সংবাদ সম্মেলন করে সরকারকে এই পরিবর্তনের জন্য অভিনন্দন না জানাত, তাহলে হয়তো এ পরিবর্তন নীরবেই ঘটে যেত। যে সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হচ্ছে, জঙ্গিবাদ কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে, সেই সরকারের আমলে কী করে এ ধরনের পরিবর্তন ঘটল, তা ভেবে আমরা বিস্মিত হই।

পাঠ্যপুস্তকে মাঝে মাঝেই পরিবর্তন আসবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। কিন্তু সেই পরিবর্তন আসবে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে অবজ্ঞা করে নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এবং আমাদের সমাজের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে উপেক্ষা করে নয়। অসাম্প্রদায়িক বিজ্ঞানমনস্ক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা একুশের ও একাত্তরের শহীদদের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ।

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব