ফারুক আহমদ ।।

এ বইটির কথা আমি প্রথম জানি ফেইসবুকের মাধ্যমে, একটি নেতিবাচক প্রচারণা থেকে। এতে বইটির লেখক মুকতাবিস-উন-নূর ও সাংবাদিক আব্দুল হামিদ মানিকের অনেকটা চরিত্র হননের চেষ্টা ছিল। খবরটি পড়ে আমি তা শেয়ারও করেছিলাম। কারণ, কোনো লেখা শেয়ার করলে তা টাইমলাইনে থাকে। পরে সময় ও সুযোগে মূল বইয়ের সঙ্গে এই পাঠটি মিলিয়ে নেয়া যায়, সত্য-মিথ্যা যাচাই করা যায়। কিন্তু খবরটি শেয়ার করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা ক্ষেপে যান লন্ডনবাসী সাংবাদিক মাহবুব রহমান। তিনি আমাকে এবং সম্ভবত এনামুল হক জুবেরকে উদ্দেশ্য করে কিছুটা ছবকও দেন ফেইস বুকের মাধ্যমে। লেখকবন্ধু আনোয়ার শাহজাহান তখন দেশে। বইটি প্রকাশের খবর পাবার পর ফোনে তাকে অনুরোধ করেছিলাম এটি কিনে নিয়ে আসার জন্য। তিনি খবর নিয়ে জানালেন বইটি লন্ডনের ব্রিক লেইনের সঙ্গীতায় পাঠানো হয়েছে। গেলাম সঙ্গীতায়। সঙ্গীতা কর্তৃপক্ষ জানালেন এ ধরণের কোনো বইয়ের হদিশ তারা জানেন না। বইটি সম্পর্কে এতো আগ্রহের কারণ, সেটি ওয়ান-ইলেভেনের ওপর একজন সাংবাদিকের লেখা। তা ছাড়া সাংবাদিক আহমেদ নূরের ওপর নির্যাতনের খবরটি আরও অনেকের মতো আমাকেও ব্যথিত করেছিল। কিন্তু মূল ঘটনাটি কী তা কোনো ভাবেই জানা সম্ভব হচ্ছিল না। ভেবেছিলাম এ বইটি থেকে তা জানা যাবে। আগ্রহের কারণ মূলত এখানেই।
গত ৫ ডিসেম্বর, সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে বসে আড্ডা দিচ্ছি। সিলেটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে এই বইটির কথাও ওঠে আসে। আমি তখন বলি বইটি সংগ্রহ করতে আমাকে কী ধরণের কসরত করতে হচ্ছে। এও বলি যে, জানলাম বইটি সঙ্গীতায় পাঠানো হয়েছে কিন্তু সেখানেও পাওয়া যায়নি বরং সঙ্গীতাও বন্ধ হয়ে গেছে। তখন সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক বেলাল আহমদ আমার কথাটি লুফে নিয়ে প্রস্তাব রাখেন, ‘বইটি আপনাকে শর্তসাপেক্ষে দেয়া যাবে। শর্তটা হচ্ছে এটির ওপর একটি রিভিই করতে হবে।’

এখানে বলে নেয়া ভালো যে, আমি লন্ডনের বাংলা সংবাদপত্রের সম্পাদকদের কাছে নানাভাবে ঋণী। এর মধ্যে প্রধান ঋণ হচ্ছে হচ্ছে গত প্রায় তিন দশকে তারা আমাকে অনেক মূল্যবান গ্রন্থ দিয়েছেন উল্লিখিত শর্তসাপেক্ষে। যে গ্রন্থগুলো হয়ত আমার পক্ষে বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে এসে পড়া খুব একটা সহজ হত না।

শর্তসাপেক্ষে পাওয়া বইটি বগলদাবা করেই রাতে ঘরে ফিরে, খাওয়া-দাওয়া পরে পড়তে বসি। লেখকের পরিচিতি পড়তে গিয়ে দ্বিতীয় প্যারায় এসে থমকে যাই। এতে লেখা আছে, “গ্র্যাজুয়েশন লাভের পর ১৯৮০ সালে তিনি তৎকালীন জনপ্রিয় সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন (!)।” এই ভুল তথ্যটি পড়ে মনে হয়েছিল হয়ত মুদ্রণ প্রমাদ। কিন্তু সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারের লেখা ভূমিকার চতুর্থ লাইনে, ‘¯œাতক শেষের পরের বছর ১৯৮০ সালে তিনি সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠ সম্পাদনা শুরু করেন’ কথাগুলো পড়ে আবারও থেমে যেতে হয়। ভাবলাম তিনিও ভুল করতে পারেন। এটি পড়া শেষ করে লেখকের মুখবন্ধ পড়তে গিয়ে আবারও চতুর্থ লাইনে এসে এই একই কথা। লেখক লিখেছেন, ‘১৯৮০ সালে সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠে যোগদানের পর লেখালেখি বলতে কালেভদ্রে কিছু প্রতিবেদন লিখেছি। নিজস্ব প্রতিবেদনের সূত্র (?)। এছাড়া মফস্বল ও টেবিলের রিপোর্টারদের লেখা দেখেছি (সম্পাদনা)। কোথাও যোগ-বিয়োগ করেছি। এই যা।”

মুকতাবিস-উন-নূর যখন এম সি কলেজের ছাত্র আমিও তখন মদনমোহন কলেজে অধ্যয়নরত। তার সাপ্তাহিক সিলহট কণ্ঠে যোগদানের খবরটি পাই বন্ধু ও সহপাঠী আজিজুল হক মানিকের মাধ্যমে এবং খুব সম্ভব ১৯৮১ সালের শেষ অথবা ১৯৮২ সালের দিকে। তারা তখন একই আদর্শের রাজনীতি করতেন। আমিও তাকে চিনতাম কিন্তু আলাপ-পরিচয় হয়নি। তাহলে তিনি এই কোন সিলেট কণ্ঠের কথা বলছেন? সন্দেহের কারণ, সাপ্তাহিক সিল্হেট কণ্ঠ প্রকাশের সময় আমি সিলেট শহরের রাজার গলির বাসিন্দা। পত্রিকাটির তৎকালীন সহ-সম্পাদক আব্দুল হামিদ মানিক থাকতেন রাজার গলির অনতিদূরে, দরগা ঝর্ণার পাড়ে। পরে আমিও ঝর্ণার পারের বাসিন্দা হই। মুসলিম সাহিত্য সংসদের সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল হকের মাধ্যমেই মানিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। ১৯৮১ সালে সাপ্তাহিক সিল্হট কণ্ঠ কাগজটি বের হবার পরে মূলত আব্দুল হামিদ মানিক ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় আমি এটির গোলাপগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে খবর পাঠাতাম। সুতরাং স্মৃতি আমার সঙ্গে প্রতারণা করার কথা নয়। তবুও এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে খুঁজতে লাগলাম দেশ থেকে নিয়ে আসা পুরনো ডায়েরি এবং তথ্যটি পেয়েও গেলাম। আমার ডায়েরির পাতায় লেখা আছে: “সাপ্তাহিক সিল্হট কণ্ঠ। ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যার প্রকাশ ৮ বৈশাখ, মঙ্গলবার ১৩৮৮ (২১ এপ্রিল ১৯৮১)। সম্পাদকম-লীর সভাপতি: রাগিব হোসেন চৌধুরী। সম্পাদক: মো. আবদুল মালিক। সহ-সম্পাদক: আবদুল হামিদ মানিক। সহকারী সম্পাদক: আবদুল মঈদ চৌধুরী।

সম্পাদকীয় ‘যাত্রা হলো শুরু’তে বলা হয়: […] সিলেটের অম্লান অতীত এবং সুন্দরতর ভবিষ্যৎ সামনে রেখে সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিকতার অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের যাত্রা আজ শুরু হলো। সিলহ্টের কণ্ঠ যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। […]
পত্রিকাটি মো. আবদুল মালিক কর্তৃক মিতা প্রিন্টার্স, কাজীটোলা, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮। মূল্য এক টাকা।” ইত্যাদি ইত্যাদি।

তথ্যটি ক্রস চেক করার পরে মনে হল বিসমিল্লায় যদি এতো বড় গলদ হয় তাহলে বইটি আর পড়ে লাভ কী? যে লেখকের কোনো ডায়েরি নেই, স্মৃতিশক্তিও দুর্বল তার বর্ণনা সঠিক না হবারই কথা। কিন্তু সন্ধ্যা নয়টার দিকে ঘরে চলে আসায় হাতে আর কোনো কাজ ছিল না। কথায় আছে, ‘নেই কাজ তো খৈ ভাজ’। তাই আমিও বইটিতে গলদ আছে তা নিশ্চিত হয়েও পড়তে শুরু করলাম। তারপর বলা যায় গলদগুলো ভুলে গিয়ে প্রায় এক নিঃশ্বাসেই বইটি পড়ে শেষ করি মূলত লেখকের বর্ণনার গুণে। অর্থাৎ পাঠককে ধরে রাখার মতো লেখার প্রাসাদগুণ যে লেখকের আছে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু এর স্থায়িত্ব ক্ষণস্থায়ী, অনেকটা ছোট গল্পের মতো। যদিও এতে বর্ণনার ছটা আছে, ঘটনার ঘনঘটা আছে, তবুও পড়ে মনে হবে, ‘হইয়াও হইল না শেষ’। অর্থাৎ আহমেদ নূরের কাহিনী দিয়ে শুরু হলেও কারা এর পেছনে ছিলেন? অথবা এর মুলে কী কারণ ছিল লেখক চেষ্টা করলে হয়ত তা উদ্ধার করতে পারতেন, কিন্তু এতোটা সময় ব্যয় করতে চাননি বলেই মনে হয়েছে। ফলে এই গ্রন্থ থেকে অনেক কিছু জানার ইঙ্গিত থাকলেও আসলে পাঠকের কোনো কিছুই জানা হবে না।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি অঘোষিতভাবে সশস্ত্রবাহিনী বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে শাসনভার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই তারিখটিকেই আমেরিকার টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার অনুকরণে বলা হয়ে থাকে ওয়ান-ইলেভেন। এই ওয়ান-ইলেভেন থেকে বইটির সূচনা হলেও এটির ঘটনাগুলো বিকশিত হয়েছে প্রেসক্লাবের তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারি আহমেদ নূরকে ওই সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়ে অমানষিক নির্যাতন করা মধ্য দিয়ে। লেখককেও হয়রাণী করা হয়, লেখকের ভাষ্যানুসারে প্রথমত আহমদ নূরের পক্ষাবলম্বন এবং ২০০৭ সালের ১৮ মার্চ প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ সিলেটে আসার পর আয়োজিত অনুষ্ঠানে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের প্রশংসার পাশাপাশি কিছু সমালোচনা ও পরামর্শ দেয়ার কারণে। তার পর এর সঙ্গে যোগ হয় সাংবাদিক নামধারী কিছু অমানুষের ইন্দনে। কিন্তু এর কারণ তিনি জানেন না এবং ইন্দনদাতাদের নাম জানলেও প্রকাশ করতে চাননি। অর্থাৎ ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মতোই তিনি কথা বলেছেন।

দেশ পরিচালিত হবে রাজনীতিবিদদের দ্বারা, এটাই নিয়ম। কিন্তু কোনো কারণে এর ব্যতিক্রম হলে আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নামে দেশে কী ধরণের আতঙ্ক ও অরাজকতার সৃষ্টি হয়; সাধারণ মানুষ থেকে আরম্ভ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতানেতৃগণ যে কীভাবে দৈহিক, মানসিক ও আর্থিক হয়রাণীর শিকারে পরিণত হন সে সম্পর্কে ধারণা লাভের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি যে একটি চমৎকার গ্রন্থ তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। গ্রন্থটিতে, ‘সখ্য’ শব্দটির জায়গায় ‘সখ্যতা’; ‘প্রিয়ভাজন জুনিওর সহকর্মী’ অর্থাৎ প্রিয়ভাজন যিনি তিনিতো জুনিওর হবেনই। এ ধরণের কিছু কিছু শব্দপ্রয়োগজাতীয় ত্রুটি ছাড়া তেমন কোনো মুদ্রণ প্রমাদ নেই। ডিজাইন ও অঙ্গসজ্জা চমৎকার। বইটির চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন নওয়াজ মারজান। প্রকাশক পা-ুলিপি প্রকাশন, সিলেট। মূল্য, বাংলাদেশে: ২৫০ টাকা, লন্ডন: ৭ পাউন্ড এবং আমেরিকায় ১০ ডলার। এটির ঐতিহাসিক মূল্য আছে কী না এ বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় ওয়ান-ইলেভেন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী পাঠক এক নিশ্বাসে পড়তে পারবেন। বইটি দীর্ঘ ভ্রমণের ভাল সঙ্গী হতে পারে। আমি বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।