সাবেক সচিব একেএম নুরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) করে পাঁচ সদস্যের যে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) করা হয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পছন্দেরই প্রতিফলন ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘রাষ্ট্রপতি যে সিদ্ধান্ত নিবেন সেই সিদ্ধান্তই আমরা মেনে নেব’ এই উক্তি করে আসলে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছেন। সাংবিধানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী দুটো বিষয় ছাড়া (প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ) অন্য সব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য। সংগত কারণেই আমরা মনে করতে পারি বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দেরই প্রতিফলন ঘটেছে।’’
তিনি আরও বলেছেন, ‘শেষ মুহূর্তে রুদ্ধশ্বাস দ্রুততার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। এ সব সন্দেহের মধ্যেও একটি বড় সন্দেহ হলো কাদেরকে নির্বাচন কমিশনে রাখা হবে সেটি ছিল শাসকমহলের পূর্ব পরিকল্পিত।’
মঙ্গলবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যলয়ে ২০ দলীয় জোটের বৈঠক শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের এসব কথা বলেছেন মির্জা ফখরুল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও নজরুল ইসলামসহ জোটের নেতারা্।
মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম, কারো কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ কিংবা কারো প্রতি ক্ষুব্ধ কোনো ব্যক্তি যেন নির্বাচন কমিশনের মতো নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ না পান। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাই হয়েছে।’
তিনি আরো বলেছেন, ‘গতকাল (৬ ফ্রেব্রুয়ারি) শেষ মুহূর্তে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সার্চ কমিটির প্রস্তাবিত ১০ (দশ ) নাম থেকে একজনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও ৪ জনকে নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সকল মহল থেকে দাবি ছিল সার্চ কমিটি কর্তৃক বাছাইকৃত এই ১০ জনের নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে এবং তাদের জীবন বৃত্তান্ত ও কর্ম অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হবে। এ পন্থা অনুসরণ করা হলে প্রক্রিয়াটি কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা পেত। কিন্তু তা করা হয়নি। আমরা নিরাশ ও হতাশ হয়েছি।’
নতুন সিইসি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘আমরা মনে করি এমন একজন বিতর্কিত সাবেক সরকারি কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। কাজেই এই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে না।’
ইসি গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে ১৩ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল বিএনপি, এমনটা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘এমন একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের পর নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে আমাদের প্রস্তাবের যৌক্তিকতা আরো দৃঢ় হয়েছে।’
২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সমালোচনা করে বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, ‘এবারের নির্বাচন কমিশন গঠনের বষিয়টি বিএনপি শুরু থেকেই অসীম গুরুত্ব ও গভীর ঐকান্তিকতার সঙ্গে নিয়েছিল। আমরা চেয়েছিলাম যাদেরকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে তারা হবেন সৎ, দলনিরপেক্ষ, দক্ষ, সাহসী, প্রজ্ঞাবান, কর্ম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য। এই উদ্দেশ্যেই বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ১৮ নভেম্বর তারিখে সংবাদ সম্মেলন করে ১৩ দফা প্রস্তাব জনগণের সামনে উপস্থাপন করেন। দেশনেত্রীর এই যৌক্তিক প্রস্তাবে দেশবাসী উৎসাহিত হয় এবং যথার্থই নিরপেক্ষ, যোগ্য ও সাহসী একটি নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে বলে আশা করে।’
অভিজ্ঞ সচিব ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের এই ঘটনা অভূতপূর্ব। রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়া এমন হওয়ার কথা নয় বলেও উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল।
তিনি বলেছেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত জনাব কে এম নুরুল হুদা যুগ্ম সচিব হিসাবে চাকুরিজীবন শেষ করেন। অতিরিক্ত সচিব এবং সচিব হয়েছেন শুধুই কাগজে। প্রকৃতপক্ষে তিনি একদিনের জন্যও অতিরিক্ত সচিব কিংবা সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন নাই। ফলে এইসব পদে দায়িত্বপালনের কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা তার নেই।’
এ সময় তিনি নতুন ইসি নিয়ে ইংরেজি দৈনিক ডেইল স্টার থেকে একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘এই তথ্য থেকেই ধরে নেয়া যায়, আমাদের দল সম্পর্কে তার মনে ক্ষোভ থাকতে পারে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ শাসনামলে ভুতাপেক্ষ পদোন্নতি পেয়ে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতি অনুরাগ পোষণ করতে পারেন । এই দুই বিপরীত পরিস্থিতির মধ্যে তিনি কতটুকু নিরপেক্ষতা অবলম্বন করবেন সে ব্যাপারে জনমনে যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে। একটি নির্বাচন কমিশনের যাত্রা শুরুতে আস্থার সংকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যার জন্ম দিতে পারে।’
বিএনপি মহাসচিব আরো বলেছেন, ‘অভিযোগ আছে ১৯৯৬ সালে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে বিএনপি সরকার বিরোধী জনতার মঞ্চের একজন সংগঠক ছিলেন নুরুল হুদা। অথচ কর্মরত সরকারি কর্মকর্তারা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারেন না। এমন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া সরকারি চাকুরি বিধির নিদারুণ লংঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অন্যদিকে ২০১০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত তিনি মিউনিসিপাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড নামের সরকারি একটি প্রজেক্টের এমডি হিসাবে সরকারের লাভজনক পদে কাজ করেছেন। আমরা সরকারি চাকুরি শেষে লাভজনক পদে অধিষ্ঠিতদের নির্বাচন কমিশনে অন্তর্ভূক্ত না করার প্রস্তাব করেছিলাম এই জন্য যে, সাধারণত সরকারের অনুগ্রহভাজনদেরই এসব পদে নিয়োগ দেয়া হয়।’
তিনি ও বলেছেন, ‘এসব কারণে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে জনাব কে এম নুরুল হুদা সম্পর্কে নেতিবাচক উপলব্ধি সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি সার্চ কমিটি এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় না নেয়া খুবই রহস্যজনক।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাব মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দিয়েছি। পরবর্তিতে বাকিদের ব্যাপারে জানানো হবে।’
বিএনপি নির্বাচন কমিশনের নতুন দায়িত্ব প্রাপ্ত মাহবুব তালুকদারের নাম প্রস্তাব করেছিল কীনা জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, ‘হ্যাঁ, আমরা মাহবুব তালুকদারের নাম প্রস্তাব করেছি।’
এর আগে মঙ্গলবার রাতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে ২০ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে যোগ দেন ২০ দলীয় জোটের নেতারা।