একুশের বইমেলা নিয়ে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, “ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত হানে এমন বিতর্কিত বই খুঁজে দেখার দায়িত্ব তো আমার নয়। এটা দেখবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আমরা এ বিষয়ে আমি কোনো কথাই বলব না।”

গত বছর বাংলা একাডেমির সায় নিয়ে বই মেলায় ‘ধর্ম অবমাননাকর’ বইয়ের প্রকাশনীর স্টল বন্ধ এবং প্রকাশককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ, যা নিয়ে ব‌্যাপক সমালোচনা হয়।

এবারও বাংলা একাডেমির সঙ্গে বৈঠকের পর পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে’ এমন বইয়ের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের এই পদক্ষেপ নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে কিছুটা রেগে গিয়ে ওই কথা বলেন শামসুজ্জামান খান।

তিনি আরও বলেন, “একটি বইয়ের জন্য যদি বইমেলার উপর আক্রমণ হয়, তাহলে আমরা পুরা স্টল বন্ধ করে দেব। তবে এ নিয়ে আলাদাভাবে কথা বলব আমরা। ব্যক্তিগতভাবে আলাপ করব এ নিয়ে।”

গত বছরে মেলায় আসা ‘ইসলাম বিতর্ক’ নামের একটি বইয়ে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ হানার উপাদান রয়েছে দাবি করে বাংলা একাডেমির সায় নিয়ে বইটির প্রকাশনা সংস্থা ব-দ্বীপের স্টল বন্ধ করে দেয় পুলিশ।

পাশাপাশি ব-দ্বীপের মালিক ও বইটির সম্পাদক শামসুজ্জোহা মানিক, এক বিপণনকর্মী এবং বইটির ছাপাখানার মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়।

মানিকের মুক্তি আন্দোলনে ভূমিকা রাখা রবিন আহসানের প্রকাশনা সংস্থা শ্রাবণ প্রকাশনীকে এবার বইমেলায় নিষিদ্ধ করে বাংলা একাডেমি। পরে সমালোচনা-প্রতিবাদের মুখে ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে তারা।

এবার বইমেলা নীতিমালার ১৩.১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, “অশ্লীল, রুচিগর্হিত, জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রতি কটাক্ষমূলক, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয় এমন বা জননিরাপত্তার জন্য বা অন্য যে কোনো কারণে গ্রন্থমেলার পক্ষে ক্ষতিকর কোনো বই বা পত্রিকা বা কোনো দ্রব্য অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বিক্রি, প্রচার, প্রদর্শন করা যাবে না।”

নীতিমালায় বলা হয়েছে, মেলা পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকাশক সেসব প্রকাশনা তার স্টল থেকে সরিয়ে ফেলতে বাধ্য থাকবেন। এ সিদ্ধান্ত মানতে না চাইলে প্রকাশকদের স্টল বরাদ্দ বাতিল হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে তিনি এ মেলায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।

নিম্নমানের প্রকাশনা প্রসঙ্গে শামসুজ্জামান খান বলেন, “বইমেলায় মৌসুমী প্রকাশকরা এসে ভিড় করছেন। তারা রাজনৈতিক চাপে স্টল বরাদ্দ নিচ্ছেন। আমরা যদি এসব মৌসুমী প্রকাশকদের বিষয়ে কঠোর হতে পারি, তবেই এ সমস্যার সমাধান করা যাবে।”

উদ্বোধন অনুষ্ঠান

বরাবরের মতোই ১ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টায় অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনের গবেষক ও রবীন্দ্র-সাহিত্য অনুবাদক ডং ইউ চেন, অস্ট্রিয়ার মেনফ্রেড কোবো, পুয়ের্তোরিকোর লুস মারিয়া লোপেজ, ভারতের চিন্ময় গুহ থাকবেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০১৬’ দেওয়া হবে।

একইদিনে প্রধানমন্ত্রীর হাতে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’-র অনুবাদে ‘ocean of sorrow’ এবং জার্মানি থেকে প্রকাশিত ‘হার্ন্ড্রেড পয়েমস ফ্রম বাংলাদেশ’ তুলে দেওয়া হবে।

গ্রন্থমেলার সময়সূচি

ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে বইমেলার দ্বার। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা এবং একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে।

প্রতি শুক্র ও শনিবারকে মেলা কর্তৃপক্ষ বলছে শিশু প্রহর। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলবে এই শিশু প্রহর।

টিএসসি, দোয়েল চত্বর দিয়ে দুটো মূল প্রবেশপথ, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তিনটি পথ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বাহিরের আটটি পথ থাকবে।

এবারই প্রথম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য একটি নতুন সুপ্রশস্ত গেইট নির্মাণ করা হয়েছে।

গ্রন্থমেলার প্রবেশ ও বাহিরপথে পর্যাপ্ত সংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মেলার সার্বিক নিরাপত্তায় এবার আড়াইশ ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

গ্রন্থমেলার বিন্যাস

বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং উল্টোদিকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় ৪ লাখ বর্গফুট জায়গায়। অমর একুশে গ্রন্থমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশকে ১২টি চত্বরে সজ্জিত করা হয়েছে।

একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮০টি প্রতিষ্ঠানকে ১১৪টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩২৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৫৪৯টি ইউনিট; মোট ৪০৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৬৩টি ইউনিট এবং বাংলা একাডেমি-সহ ১৫টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৬ হাজার বর্গফুট আয়তনের ১৫টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

১০০টি লিটল ম্যাগাজিনকে বর্ধমান হাউজের দক্ষিণ পাশে লিটল ম্যাগাজিন কর্নার স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যারা বই প্রকাশ করেছেন তাদের বই বিক্রি/প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে।

বইমেলার জন‌্য প্রস্তুত এখন বাংলা একাডেমি
বইমেলার জন‌্য প্রস্তুত এখন বাংলা একাডেমি

গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই ৩০% কমিশনে এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫% কমিশনে বই বিক্রি করবে।

একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলা একাডেমির ২টি প্যাভিলিয়ন, একাডেমির শিশুকিশোর প্রকাশনাভিত্তিক বিক্রয়কেন্দ্র এবং একাডেমির সাহিত্য মাসিক উত্তরাধিকার-এর বিক্রয়কেন্দ্র থাকবে।

এবারও শিশুকর্নার মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে থাকবে। এই কর্নারকে শিশুকিশোর বিনোদন ও শিক্ষামূলক অঙ্গসজ্জায় সজ্জিত করা হবে।

এবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে। মেলায় আসা মানুষের বসার স্থানসহ নান্দনিক ফুলের বাগানও নির্মাণ করা হয়েছে।

মেলা সম্পূর্ণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত স্বাধীনতা স্তম্ভ ও এর পাশের স্থানকে নান্দনিকভাবে গ্রন্থমেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে যাতে স্বাধীনতার স্তম্ভের আলোক-বিচ্ছুরণে মেলা প্রাঙ্গণ আলোকিত হয়ে ওঠে।

মেলা পরিচালনার কমিটির সদস্য সচিব জালাল আহমেদ জানান, গুগল স্ট্রিট ভিউয়ের মাধ্যমে মেলার যে কোনো স্টল খুঁজে নেওয়া যাবে। এছাড়া দোয়েল চত্বর ও টিএসসিতে দুটি বড় পর্দায় মেলায় প্রবেশের তথ্য জানিয়ে দেওয়া হবে।

সাহিত্য সম্মেলন ও পুরস্কার

বইমেলা উপলক্ষে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন দেশের ছয়জন লেখক-বুদ্ধিজীবীকে ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন লেখক সম্মাননা-২০১৭’ প্রদান করা হবে।

এছাড়াও একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০১৬ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে ‘গুণগতমান বিচারে’ সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি ‍পুরস্কার’ এবং ২০১৬ সালের গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে ‘শৈল্পিক বিচারে’ সেরা গ্রন্থ প্রকাশের জন্য ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে।

২০১৬ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্যে থেকে ‘গুণগতমান বিচারে’ সর্বাধিক গ্রন্থের জন্য ১টি প্রতিষ্ঠানকে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই’ স্মৃতি পুরস্কার’ এবং এ বছরের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হবে। মেলার শেষ দিনে দেওয়া হবে ‘সৈয়দ ওয়াল্লীউল্লাহ্ সাহিত্য পুরস্কার-২০১৬’।