খালিদ হোসেন ।।

‘অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকিয়ে যায়’। বহুল প্রচলিত এই প্রবাদটি এখন যেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে চলেছে। দীর্ঘ ১০ বছর বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে দলটি ক্রমশই তাদের মিত্র হারাচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের প্রেক্ষাপটেও বিএনপির মিত্র ছিল। সেসময় বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকলেও বিএনপির প্রতি আস্থা রেখে নির্বাচন থেকে বিরত থেকে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নেয়।

পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি এবং ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহতের আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। এতে বিএনপি জোটের বাইরে থাকা কয়েকটি দলের প্রধান জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগ করতে বিএনপিকে পরামর্শ দেয়।

‘জাতীয় ঐক্য’কে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করেছে বিএনপি’। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এমাজউদ্দিনকে একপ্রকার ধমক দেয় জামায়াত। যার অংশ হিসেবে দলটির পক্ষ থেকে অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের কড়া সমালোচনা করে বিবৃতিও দেয়া হয়। এরপর নিজেদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপি মহাসচিব সংবাদ সম্মেলনে করে জানান জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ নিয়ে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ এর বক্তব্য একান্তুই তার নিজের। তার বক্তব্যে বিএনপির কোনো সমর্থন নেই। আর এতেই থমকে যায় ‘জাতীয় ঐক্য’। সেই থেকে মুক্তিযুদ্ধপন্থী রাজনৈতিক দল এবং বুদ্ধিজীবিদের সঙ্গে বিএনপির দুরত্ব স্পষ্ট হতে থাকে।

জামায়াত ইস্যুতে দেশীয় মিত্রদের পাশাপাশি বিদেশি মিত্রদেরও বিএনপি পাশে পাচ্ছে না বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। জামায়াত সঙ্গী থাকায় ভারত, রাশিয়াসহ পশ্চিমাদের আস্থায় আনতে পারছে না বিএনপি। অভ্যন্তীরণ সঙ্কটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের শুভাকাঙ্ক্ষিরাও আগের মতো বিএনপিকে সমর্থন দিতে পারছে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সঙ্গেও বিএনপির সম্পর্ক আগের মতো যাচ্ছে না।

বিগত ৪দলীয় জোট সরকার ঢাকায় তাইওয়ানের দূতাবাস খোলার অনুমতি দিয়ে বিএনপি তাদের অন্যতম মিত্র চীনের বিরাগভাজন হয়।

সম্প্রতি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করলে বৈদেশিক কূটনীতিকরা তখন বলেছিলেন বিএনপির একতরফা নির্বাচন করা ঠিক হবে না। কিন্তু ৫জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তারা কোনো কথা বলেনি। তারা এখন কোথায়?’

এদিকে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটের মধ্যেও আস্থাহীনতা চরম পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়াও বিএনপি আগামী নির্বাচনে অন্দোলনের বাইরে থেকে সরকারের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করছে মনে করে বিএনপি নির্ভর রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মতো করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘২০১৩সাল পর্যন্ত ভারত ছাড়া সকলেই বিএনপির মিত্র ছিলো। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন বিএনপির কোনো মিত্র নেই। দেশীয় প্রেক্ষাপটে একমাত্র জামায়াত আর খুচরা কিছু রাজনৈতিক দল ছাড়া বিএনপির মিত্র নেই।’

দিনে দিন বিএনপি মিত্রহীন পয়ে পড়ছে কিনা এমন প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. নুরুল আমিন বেপারি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘এদেশের রাজনীতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির মিত্র প্রয়োজন হবে না। বিশ্বে মিত্র তো আওয়ামী লীগও হারাচ্ছে। বাংলাদেশে চীন সাবমেরিন দেয়ার পর শোনা যাচ্ছে ইন্ডিয়া নাকি গোস্যা হয়েছে। ইন্ডিয়ার মতো একটা বন্ধু আওয়ামী লীগ হারালে আর কিছু লাগে না। তবে একটা ফেয়ার নির্বাচন হলে বিএনপির মিত্র শক্তি লাগে না।’

তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে। এজন্য চায়নাকে প্রতিহত করতে ভারতের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় আমেরিকা। সুতরাং তাদের একটা বন্ধু হারলে বিএনপির আর বন্ধুর প্রয়োজন হবে না।’