বিএনপি ও জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত ২২ জেলার এমপিরা বিশেষ নিরাপত্তার আওতায় আসছেন। সার্বক্ষণিক গানম্যানসহ বাসা-বাড়িতে পুলিশি পাহারা জোরদারের পাশাপাশি সাদা পোশাকের গোয়েন্দারাও তাদের ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকবেন। সম্প্রতি গাইবান্ধায় সরকার দলীয় এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন খুন হওয়ার পর এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ২০১৩ সালে নীলফামারীতে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের ওপর হামলার বিষয়টিও আমলে নেওয়া হয়েছে।

বুধবার পুলিশ সদর দফতর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের ওপর হামলার আশঙ্কা নেই। তারপরও বাড়তি সতর্কতার অংশ হিসেবে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘গাইবান্ধায় এমপি লিটন খুন হওয়ার পর অন্য এমপিদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কারো ওউপর হামলার আশঙ্কা নেই। জামায়াত-শিবিরের তৎপরতা রয়েছে এমন জেলার এমপিদের বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।’

জানা গেছে, গাইবান্ধায় এমপি লিটন খুন হওয়ার পর জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত ২২ জেলার এমপিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদর দফতর থেকে ওইসব জেলার এসপিদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। ওইসব এমপিদের সার্বক্ষণিক গানমানের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশি তৎপরতা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনের এমপিদের পরামর্শও নিতে বলা হয়েছে।

এর আগে ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজিম খুন হওয়ার আশঙ্কায় থানায় কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। ওই এমপিরও নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলো হচ্ছে নীলফামারী, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বগুড়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, সিলেট, ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, পাবনা, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সাতক্ষীরাসহ সন্ত্রাসকবলিত বেশ কয়েকটি জেলায় জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব মোকাবেলায় যৌথবাহিনী অভিযান চালায়। পরে ওইসব জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। ওই সময় নীলফামারীতে আসাদুজ্জান নূরের গাড়ি বহরে হামলা চালায় শিবির ক্যাডাররা। হামলার ঘটনায় তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে।

সম্প্রতি গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন নিজ বাড়ির বৈঠকখানায় প্রকাশ্যে খুন হওয়ার পর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে অন্য সংসদ সদস্যদের মধ্যেও। পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, চলাফেরার সময় যেন সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করা হয়। অনেক সংসদ সদস্য উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, মন্ত্রী, সচিব, ডিসি এমনকি ব্যবসায়ীদের অনেকেই গানম্যান পেয়ে থাকেন। অথচ সংসদ সদস্যদের গানম্যান দেওয়া হচ্ছে না। কেউ নিরাপত্তা পাবে কেউ পাবে না তা হবে না।

গত শনিবার নিহত সংসদ সদস্য লিটনের জানাজা হয় গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। এ সময় সংসদ সদস্যরা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার বিষয়টি ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়াকে অবহিত করেন। পরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে সব সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি জানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে একমত। তিনি নিশ্চয় এমপিদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন।’

এরপর প্রধানমন্ত্রী এমপিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশপ্রধানকে নির্দেশ দেন। এরই অংশ হিসাবে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজিম বলেন, ‘সব সংসদ সদস্যই নিরাপত্তার জন্য অনেকবার বলেছেন। সম্প্রতি আমাদের ডেপুটি স্পিকার মহোদয়ও বলেছেন। সবাই বলছেন। আসলে একজন গানম্যান দরকার।’

উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের ৬ জুন সন্ত্রাসীরা খুলনা থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত আব্দুল গফুরকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর ১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন বরিশালের মঠবাড়িয়া থেকে নির্বাচিত এমপি সওগাতুল আলম সহুর। একই বছরের ৩ মে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থেকে নির্বাচিত নুরুল হককে হত্যা করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১০ জানুয়ারি হত্যা করা হয় ভোলা থেকে নির্বাচিত এমপি মোতাহার উদ্দীন আহমেদকে। একই বছরের ১৬ মার্চ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন নরসিংদীর মনোহরদী থেকে নির্বাচিত এমপি ফজলুর রহমান। ওই বছরই ১ আগস্ট ও ডিসেম্বরে মাত্র চার মাসের ব্যবধানে হত্যা করা হয় ময়মনসিংহের অ্যাডভোকেট ইমান আলী এমপি এবং কুষ্টিয়ার কুমারখালী আসন থেকে নির্বাচিত এমপি গোলাম কিবরিয়াকে। আর ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি হত্যা করা হয় নেত্রকোনার সাংসদ আব্দুল খালেককে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। মন্ত্রিসভার সদস্য ও আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতকেও সে রাতে হত্যা করে ঘাতকরা।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুরের টঙ্গীর নোয়াগাঁও এমএ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জনসভা চলাকালে গুলি চালিয়ে গাজীপুরের সাংসদ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে হত্যা করা হয়। পরের বছরই ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদরের বৈদ্যের বাজারে জনসভা শেষে বের হওয়ার পথে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া।

সর্বশেষ এ তালিকায় যুক্ত হয় মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের নাম।